(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: -)
محاضرات في علوم القرآن - غانم قدورى   (غانم قدوري الحمد)

القسم: علوم القرآن وأصول التفسير


الكتاب: محاضرات في علوم القرآن

المؤلف: أبو عبد الله غانم بن قدوري بن حمد بن صالح، آل موسى فَرَج الناصري التكريتي

الناشر: دار عمار - عمان

الطبعة: الأولى، 1423 هـ - 2003 م

عدد الصفحات: 264

[ترقيم الكتاب موافق للمطبوع]

تاريخ النشر بالشاملة: 15 ربيع الأول 1433

কুরআন বিজ্ঞানের ওপর বক্তৃতামালা - গানিম কাদুরি   (গানিম কাদুরি আল-হামাদ)

বিভাগ: কুরআন বিজ্ঞান এবং তাফসিরের মূলনীতি


বই: কুরআন বিজ্ঞানের ওপর বক্তৃতামালা

লেখক: আবু আব্দুল্লাহ গানিম বিন কাদুরি বিন হামাদ বিন সালিহ, আল মুসা ফারাজ আল-নাসিরি আল-তিকরিতি

প্রকাশক: দার আম্মার - আম্মান

সংস্করণ: প্রথম, ১৪২৩ হিজরি - ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ

পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৬৪

[গ্রন্থটির নম্বরবিন্যাস মুদ্রিত সংস্করণের অনুরূপ]

শামিলা লাইব্রেরিতে প্রকাশের তারিখ: ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৩

(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ৫)
‌‌مقدمة

الحمد لله ربّ العالمين، والصلاة والسلام على سيدنا محمد وعلى آله وصحابته أجمعين، أما بعد:

فإن القرآن الكريم هو كلام الله تعالى، أنزله على رسوله سيدنا محمد صلى الله عليه وسلم لهداية البشرية إلى الدين القويم، فقرأه على الناس، ودعاهم إليه، وعلّمه لصحابته الذين آمنوا بدعوته، فحفظوه في الصدور، ودوّنوه في السطور، وعاشوا يهتدون بهديه، ويقتبسون من نوره، ويعملون بأحكامه، ويتخلّقون بآدابه، حتى تحقّق فيهم قول الله تعالى: كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتابِ لَكانَ خَيْراً لَهُمْ مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفاسِقُونَ (110) [آل عمران].

ولا شك في أن الوقوف على تأريخ القرآن وعلومه يكشف عن حقيقة هذا الكتاب ومصدره، ويبيّن كيفية كتابته وجمعه، وقراءته، وتفهّم معانيه، ويوضح جهود علماء الأمة من لدن عصر الصحابة في حفظ النص القرآني وصيانته وتيسير تلاوته ومعرفة معانيه، تلك الجهود التي يتبين للمتأمل من خلالها سرّ الخلود لهذا الكتاب العظيم الذي تكفل الله تعالى بحفظه بقوله: إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحافِظُونَ (9) [الحجر].

وكان علماء الأمة قد كتبوا في علوم القرآن وفي المباحث المتصلة بتأريخه، منذ بدء عصر تدوين العلوم الإسلامية إلى زماننا، مئات الكتب التي يعجز المرء غير المتخصص عن الوقوف على كثير منها، أو الاستفادة منها، لما كانت تتّسم به من التفصيل والشمول الذي لا يحتاج إلى كثير منه القارئ في هذا العصر، كما أن أسلوب كتابتها لم يعد مألوفا لدى كثير من قراء زماننا الذين ضعفت صلتهم بكتب التراث.

ومن هنا كانت الحاجة تدعو إلى تقديم خلاصة تلك المباحث إلى القراء
ভূমিকা

সকল প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নেতা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি এবং তাঁর পরিবারবর্গ ও সকল সাহাবী (صحابة)-র প্রতি। অতঃপর:

নিশ্চয়ই কুরআন কারীম মহান আল্লাহর বাণী, যা তিনি তাঁর রাসূল আমাদের নেতা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর নাযিল করেছেন মানবজাতিকে সঠিক দ্বীনের দিকে হিদায়াত প্রদানের জন্য। তিনি তা মানুষের সামনে পাঠ করেছেন, তাদেরকে এর দিকে আহ্বান করেছেন এবং তাঁর সেই সাহাবী (صحابة)-দের তা শিক্ষা দিয়েছেন যারা তাঁর দাওয়াতের প্রতি ঈমান এনেছিলেন। ফলে তাঁরা তা অন্তরে হিফজ করেছেন এবং পাণ্ডুলিপিতে লিপিবদ্ধ করেছেন। তাঁরা এর হিদায়াত অনুযায়ী জীবন অতিবাহিত করেছেন, এর নূর থেকে আলো গ্রহণ করেছেন, এর বিধানাবলী অনুযায়ী আমল করেছেন এবং এর আদবসমূহ দ্বারা নিজেদের চরিত্র গঠন করেছেন। এমনকি তাঁদের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর এই বাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছে: "তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভূত করা হয়েছে; তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে বাধা দাও এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখো। আর যদি আহলে কিতাবগণ ঈমান আনত, তবে তা তাদের জন্য কল্যাণকর হতো। তাদের মধ্যে কিছু মুমিন আছে, তবে তাদের অধিকাংশই পাপাচারী (فاسقون)।" (১১০) [আলে ইমরান]।

নিঃসন্দেহে কুরআনের ইতিহাস ও এর জ্ঞানসমূহ সম্পর্কে অবগত হওয়া এই কিতাবের হাকিকত ও এর উৎসের স্বরূপ উন্মোচন করে এবং এর লিখন পদ্ধতি, সংকলন, তিলাওয়াত ও এর অর্থ অনুধাবনের প্রক্রিয়া স্পষ্ট করে। পাশাপাশি এটি সাহাবী (صحابة)-দের যুগ থেকে শুরু করে এই উম্মতের ওলামায়ে কেরামের সেই প্রচেষ্টাসমূহকেও ফুটিয়ে তোলে যা তাঁরা কুরআনের পাঠ সংরক্ষণ, এর সুরক্ষা, তিলাওয়াত সহজীকরণ এবং এর মর্মার্থ অনুধাবনের ক্ষেত্রে ব্যয় করেছেন। সেই প্রচেষ্টাসমূহের মাধ্যমেই চিন্তাশীল ব্যক্তির কাছে এই মহান কিতাবের অবিনশ্বরতার রহস্য স্পষ্ট হয়, যার সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা গ্রহণ করেছেন তাঁর এই বাণীর মাধ্যমে: "নিশ্চয়ই আমিই এই যিকির (কুরআন) নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।" (৯) [আল-হিজর]।

ইসলামী জ্ঞানসমূহ সংকলনের যুগের শুরু থেকে আমাদের সময় পর্যন্ত এই উম্মতের ওলামায়ে কেরাম উলূমুল কুরআন এবং এর ইতিহাসের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে শত শত কিতাব রচনা করেছেন, যার অনেকগুলো সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভ করা বা সেগুলো থেকে উপকৃত হওয়া একজন বিশেষজ্ঞ নন এমন ব্যক্তির পক্ষে দুঃসাধ্য। কারণ সেসব কিতাব অত্যন্ত বিস্তারিত ও ব্যাপক ছিল, যা বর্তমান সময়ের একজন সাধারণ পাঠকের খুব একটা প্রয়োজন হয় না। তদুপরি, সেগুলোর রচনাশৈলী বর্তমান যুগের অনেক পাঠকের কাছে পরিচিত নয়, যাদের ঐতিহ্যবাহী ইলমী কিতাবসমূহের সাথে সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়েছে।

এ কারণেই পাঠকদের সামনে সেই সব গবেষণার একটি সারসংক্ষেপ উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ৬)
غير المتخصصين عامة، وإلى طلبة الدراسات الإسلامية والعربية الجامعية خاصة، في أسلوب يجمع بين التركيز على الموضوعات الأساسية في تأريخ القرآن وعلومه، وبين السهولة في العرض، والوضوح في التعبير، مع عدم التفريط بمتطلبات البحث العلمي الجاد، من الاعتماد على المصادر الأصلية، والمنهجية الموضوعية التي تقرر الحقائق من خلال الأدلة والنصوص الموثقة.

وكانت هذه المحاضرات قد كتبت وصدرت طبعتها الأولى منذ عشرين سنة (1)، وهذه إن شاء الله الطبعة الثانية مزيدة ومنقحة بعد أن أعدت كتابة موضوعاتها، لتحقيق غرضين هما: استدراك ما فاتني في الطبعة الأولى من مصادر ومعلومات، وتيسير كتابة بعض المباحث لتكون أقرب إلى فهم القارئ المبتدئ أو غير المتخصص، مع المحافظة على المنهج الذي ظهرت فيه الطبعة الأولى المستندة إلى دراسة موضوعات علوم القرآن من خلال الأبواب أو الفصول الأربعة الآتية:

الأول: نزول القرآن الكريم.

الثاني: تدوين القرآن الكريم.

الثالث: قراءة القرآن الكريم.

الرابع: تفسير القرآن الكريم.

وقد حرصت في هذه المحاضرات على الاعتماد على المصادر الأصلية الموثقة من نصوص القرآن الكريم والسنّة المشرفة، والروايات التاريخية الصحيحة، وفهم علماء الأمة العدول لها. مع التركيز على الحقائق الثابتة المتفق عليها، وترك الآراء الشاذة التي لا تقوم على دليل ولا تسندها حجة. والله من وراء القصد، وهو يهدي السبيل.

المؤلف 15/ صفر/ 1420 هـ 30/ مايس/ 1999 م

--------------------------------------------

(1) صدرت الطبعة الأولى في بغداد سنة 1981 م بمساعدة جامعة بغداد.
সাধারণ অ-বিশেষজ্ঞদের জন্য এবং বিশেষভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ইসলামি ও আরবি শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি রচিত। এর রচনারীতিতে কুরআনের ইতিহাস ও উলুমুল কুরআনের মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব প্রদানের পাশাপাশি উপস্থাপনার সহজবোধ্যতা ও অভিব্যক্তির স্বচ্ছতার সমন্বয় করা হয়েছে। তবে এতে মূল উৎসসমূহের ওপর নির্ভরতা এবং বস্তুনিষ্ঠ পদ্ধতির মতো জ্ঞানতাত্ত্বিক গবেষণার কোনো আবশ্যিক শর্তই উপেক্ষা করা হয়নি, যা দলিল ও নির্ভরযোগ্য (موثقة) ভাষ্যের মাধ্যমে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে।

এই লেকচারগুলো বিশ বছর আগে লিখিত ও প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল (১)। ইনশাআল্লাহ, এটি এর পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত দ্বিতীয় সংস্করণ। এর বিষয়বস্তুগুলো পুনরায় রচনার ক্ষেত্রে দুটি লক্ষ্য ছিল: প্রথমত, প্রথম সংস্করণে যে সকল উৎস ও তথ্য বাদ পড়েছিল তা সংযোজন করা; এবং দ্বিতীয়ত, কিছু আলোচনার ভাষ্য আরও সহজ করা যাতে তা প্রাথমিক শিক্ষার্থী বা অ-বিশেষজ্ঞ পাঠকের কাছে বোধগম্য হয়। তবে প্রথম সংস্করণের সেই পদ্ধতিটি বজায় রাখা হয়েছে, যেখানে উলুমুল কুরআনের বিষয়গুলো নিম্নোক্ত চারটি অধ্যায় বা পরিচ্ছেদের আলোকে আলোচনা করা হয়েছিল:

প্রথম: কুরআন কারিম অবতীর্ণ হওয়া (نزول)।

দ্বিতীয়: কুরআন কারিম সংকলন (تدوين)।

তৃতীয়: কুরআন কারিম তিলাওয়াত (قراءة)।

চতুর্থ: কুরআন কারিমের তাফসির (تفسير)।

আমি এই লেকচারগুলোতে কুরআন কারিমের নস (نصوص), সম্মানিত সুন্নাহ, সঠিক (صحيحة) ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং উম্মাহর ন্যায়পরায়ণ (عدول) আলেমদের ব্যাখ্যার ন্যায় নির্ভরযোগ্য (موثقة) ও মূল উৎসসমূহের ওপর নির্ভর করতে সচেষ্ট হয়েছি। পাশাপাশি সর্বসম্মত প্রতিষ্ঠিত সত্যগুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছি এবং দলিল-প্রমাণহীন বিচ্ছিন্ন (شاذة) মতামতগুলো পরিহার করেছি। আল্লাহই মূল লক্ষ্য এবং তিনিই সঠিক পথ প্রদর্শনকারী।

লেখক: ১৫ সফর, ১৪২০ হিজরি / ৩০ মে, ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দ

--------------------------------------------

(১) প্রথম সংস্করণটি ১৯৮১ সালে বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় বাগদাদ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ৭)
‌‌تمهيد علوم القرآن وتأريخ التأليف فيها

تعني عبارة (علوم القرآن) المباحث والدراسات التي كتبت حول القرآن الكريم، وهي تتناول أربعة موضوعات أساسية، الأول: مصدر القرآن أو كيفية إنزاله وتلقي النبي صلى الله عليه وسلم له، والثاني: كتابة القرآن وجمعه ونسخه في المصاحف، والثالث: تلاوة القرآن وقراءاته، والرابع: تفسير القرآن وكيفية فهم آياته. ويتألف كل موضوع من هذه الموضوعات من عدد من المباحث التي يتكون من مجموعها ما يعرف بعلوم القرآن، ويتصل بعلوم القرآن أيضا المباحث المتعلقة بفضائل القرآن، والدراسات التي تبحث في وجوه إعجازه.

وترتبط نشأة (علوم القرآن) ببدء نزول القرآن الكريم على سيدنا محمد صلى الله عليه وسلم وتلاوته على الناس، وأمره أصحابه بكتابته. وتطورت تلك النشأة مع تطور الحياة العلمية والثقافية للأمة- وانتقلت من مرحلة الملاحظات المتفرقة إلى مرحلة البحث المنهجي المدوّن. ويمكن أن ندرس نشأة (علوم القرآن) وتطورها من خلال المراحل الأربع الآتية:

 

‌‌المرحلة الأولى: علوم القرآن قبل عصر تدوين العلوم:

يمكن للباحث أن يجد بدايات علوم القرآن في عصر النبوة متمثلة بالملاحظات والأحاديث التي تلقّاها الصحابة عن رسول الله صلى الله عليه وسلم المتصلة بالقرآن

الكريم، فمن سؤال الصحابة النبي صلى الله عليه وسلم عن كيفية تلقيه القرآن بدأت المباحث المتعلقة بنزول القرآن، ومن قراءته صلى الله عليه وسلم القرآن على أصحابه وحثّهم على تلاوته وحفظه نشأت المباحث الخاصة بالقراءات القرآنية، ومن أمره صلى الله عليه وسلم كتّاب الوحي بكتابة ما ينزل عليه من القرآن تأكدت سنّة كتابة القرآن وجمعه في الصحف،
উলূমুল কুরআন (علوم القرآن) এবং এর রচনার ইতিহাসের ভূমিকা

'উলূমুল কুরআন' (علوم القرآن) পরিভাষাটি দ্বারা ঐ সকল আলোচনা ও গবেষণাকে বোঝায় যা পবিত্র কুরআনুল কারিমকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে। এটি চারটি মৌলিক বিষয়বস্তুকে অন্তর্ভুক্ত করে: প্রথমত, কুরআনের উৎস অথবা এটি অবতীর্ণ হওয়ার পদ্ধতি এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তা গ্রহণ। দ্বিতীয়ত, কুরআন লিপিবদ্ধকরণ, এর সংকলন এবং মাসহাফসমূহে এর অনুলিপি তৈরি করা। তৃতীয়ত, কুরআনের তিলাওয়াত এবং এর কিরাতসমূহ (قراءات)। চতুর্থত, কুরআনের তাফসির এবং এর আয়াতসমূহ অনুধাবনের পদ্ধতি। এই বিষয়গুলোর প্রত্যেকটি কতগুলো উপ-আলোচনা নিয়ে গঠিত, যার সামগ্রিক রূপই উলূমুল কুরআন (علوم القرآن) হিসেবে পরিচিত। এছাড়া কুরআনের মর্যাদা (فضائل) সংক্রান্ত আলোচনা এবং এর অলৌকিকত্বের (إعجاز) দিকসমূহ নিয়ে গবেষণাও উলূমুল কুরআনের সাথে সম্পৃক্ত।

উলূমুল কুরআনের (علوم القرآن) উদ্ভব আমাদের নেতা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হওয়া, মানুষের সামনে তা তিলাওয়াত করা এবং সাহাবীগণকে তা লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ প্রদানের সাথে সম্পৃক্ত। উম্মতের ইলমি ও সাংস্কৃতিক জীবনের বিকাশের সাথে সাথে এরও বিকাশ ঘটে এবং এটি বিচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণের পর্যায় থেকে পদ্ধতিগত ও সংকলিত গবেষণার পর্যায়ে উন্নীত হয়। আমরা উলূমুল কুরআনের (علوم القرآن) উৎপত্তি ও বিকাশকে নিম্নোক্ত চারটি পর্যায়ের মাধ্যমে অধ্যায়ন করতে পারি:

 

প্রথম পর্যায়: জ্ঞান-বিজ্ঞান সংকলনের যুগের পূর্বে উলূমুল কুরআন (علوم القرآن):

একজন গবেষক নবুওয়তের যুগেই উলূমুল কুরআনের (علوم القرآن) সূচনা খুঁজে পেতে পারেন, যা মূলত কুরআনুল কারিম সংশ্লিষ্ট ঐ সকল পর্যবেক্ষণ ও হাদিসের মাঝে বিদ্যমান ছিল যা সাহাবীগণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে গ্রহণ করেছিলেন। সাহাবীগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরআন প্রাপ্তির পদ্ধতি সম্পর্কে যে প্রশ্ন করতেন, তা থেকেই কুরআন অবতীর্ণ হওয়া সংক্রান্ত আলোচনার সূত্রপাত ঘটে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক সাহাবীগণের সামনে কুরআন তিলাওয়াত এবং তাদের তিলাওয়াত ও তা হিফজ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান থেকে কুরআনের কিরাত (قراءات) সংক্রান্ত আলোচনার উদ্ভব ঘটে। ওহী লেখকদের প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ—যা তাঁর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে তা লিখে রাখার জন্য—এর মাধ্যমে কুরআন লিপিবদ্ধ করা এবং তা সহীফাসমূহে সংকলনের সুন্নাহ (سنة) সুনিশ্চিত হয়।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ৮)
ونشأت من ذلك المباحث المتعلقة بكتابته ورسمه، ومن بيانه صلى الله عليه وسلم لمعنى عدد من الآيات والكلمات القرآنية حين أشكل فهمها على بعض الصحابة نشأت المباحث المتعلقة بفهم القرآن وتفسيره.

وتجمعت تلك الملاحظات لدى علماء الصحابة، واختزنتها ذاكرتهم، ونقلوها إلى تلامذتهم من التابعين، لكنهم لم يدوّنوها تدوينا منظما، لأن العلوم لم تكن قد دوّنت في عصرهم، وكان القرآن الكريم أول كتاب مدوّن عرفته الأمة، وحرصوا في الجيل الأول ألّا يظهر بجانبه كتاب آخر، لكن الضرورة أملت على علماء الأمة من التابعين وتابعيهم تدوين العلوم، وكان نصيب علوم القرآن من جهودهم كبيرا.

 

‌‌المرحلة الثانية: علوم القرآن في عصر التدوين

يمكن القول إن تدوين علوم اللغة العربية وعلوم القرآن وغيرها قد بدأ في أواخر القرن الأول الهجري ومطلع القرن الثاني، وأن القرن الثاني لم ينقض إلا ومعظم العلوم قد دوّنت وظهرت فيها المؤلفات، ومن أوائل الكتب المؤلفة في علوم القرآن كتاب «التفسير» لعبد الله بن عباس (ت 68 هـ) الذي رواه تلميذه مجاهد بن جبر المكي (ت 104 هـ) (1)، ومنها كتاب في هجاء (رسم) المصاحف لعبد الله بن عامر اليحصبي الدمشقي (ت 118 هـ) (2). وكتاب قراءة أبي عمرو بن العلاء (ت 154 هـ) (3)، ثم تتابع التأليف وكثر في علوم القرآن.

ويقدّم ابن النديم صورة واضحة في كتابه «الفهرست» عن حركة التأليف في علوم القرآن، حتى سنة 377 هـ وهي سنة تأليفه الكتاب، حيث ذكر أكثر من 250 كتابا في موضوعات متعددة من علوم القرآن، نشير إلى أهمها (4):

--------------------------------------------

(1) ابن النديم: الفهرست ص 36.

(2) المصدر نفسه ص 39.

(3) المصدر نفسه ص 31.

(4) المصدر نفسه ص 36 - 41.
এবং সেখান থেকেই এর লিখন পদ্ধতি ও লিপিকলা (رسم) সংক্রান্ত আলোচনার উদ্ভব হয়। আবার কুরআনের কিছু আয়াত ও শব্দের অর্থ যখন কিছু সাহাবীর নিকট অস্পষ্ট মনে হয়েছে, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) সেগুলোর যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, তা থেকেই কুরআন অনুধাবন ও এর তাফসির (تفسير) সংক্রান্ত আলোচনার উৎপত্তি হয়েছে।

এই পর্যবেক্ষণসমূহ বিজ্ঞ সাহাবীদের নিকট পুঞ্জীভূত হয় এবং তাঁদের স্মৃতিতে সংরক্ষিত থাকে। তাঁরা এগুলো তাঁদের উত্তরসূরি তাবিঈন (التابعين)-দের নিকট পৌঁছে দেন। তবে তাঁরা এগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে সংকলিত করেননি; কারণ তখন পর্যন্ত শাস্ত্রসমূহ সংকলিত হওয়ার যুগ শুরু হয়নি। পবিত্র কুরআনই ছিল এই উম্মতের জানা প্রথম সংকলিত কিতাব। প্রথম প্রজন্মের সাহাবীরা চেয়েছিলেন যাতে কুরআনের পাশাপাশি অন্য কোনো কিতাব প্রকাশ না পায়। কিন্তু পরবর্তীতে তাবিঈন (التابعين) এবং তাবি-তাবিঈন (تابع التابعين)-দের যুগের আলেমদের নিকট শাস্ত্রসমূহ সংকলন করা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে এবং তাঁদের এই প্রচেষ্টায় উলূমুল কুরআনের (علوم القرآن) অংশ ছিল অনেক বড়।

 

‌‌দ্বিতীয় পর্যায়: সংকলন যুগে উলূমুল কুরআন (علوم القرآن)

এটা বলা সম্ভব যে, আরবি ভাষা ও উলূমুল কুরআনের (علوم القرآن) সংকলন হিজরি প্রথম শতাব্দীর শেষভাগে এবং দ্বিতীয় শতাব্দীর শুরুতে আরম্ভ হয়। দ্বিতীয় শতাব্দী অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই অধিকাংশ শাস্ত্র সংকলিত হয়ে যায় এবং সেগুলোতে মৌলিক গ্রন্থাদি রচিত হয়। উলূমুল কুরআনের (علوم القرآن) প্রাথমিক রচনাবলির মধ্যে অন্যতম হলো আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (মৃত্যু ৬৮ হিজরি)-এর 'তাফসির' নামক কিতাব, যা তাঁর ছাত্র মুজাহিদ ইবনে জাবর আল-মাক্কি (মৃত্যু ১০৪ হিজরি) বর্ণনা (رواه) করেছেন (১)। তদ্রূপ আব্দুল্লাহ ইবনে আমির আল-ইয়াহসাবি আদ-দিমাশকি (মৃত্যু ১১৮ হিজরি)-এর মুসহাফসমূহের বর্ণবিন্যাস বা লিপিকলা رسم (هجاء) বিষয়ক একটি কিতাব (২) এবং আবু আমর ইবনুল আলা (মৃত্যু ১৫৪ হিজরি)-এর কিরাত (قراءة) বিষয়ক কিতাব (৩)। এরপর উলূমুল কুরআনের (علوم القرآن) উপর ধারাবাহিকভাবে বহু গ্রন্থ রচিত হতে থাকে এবং এর পরিধি বৃদ্ধি পায়।

ইবনুন নাদিম তাঁর 'আল-ফিহরিস্ত' কিতাবে ৩৭৭ হিজরি সাল পর্যন্ত উলূমুল কুরআনের (علوم القرآن) রচনাধারা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরেছেন। এটি ছিল তাঁর কিতাবটি রচনার বছর। সেখানে তিনি উলূমুল কুরআনের (علوم القرآن) বিভিন্ন বিষয়ে ২৫০টিরও বেশি কিতাবের কথা উল্লেখ করেছেন। আমরা সেগুলোর মধ্য থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু কিতাবের প্রতি ইঙ্গিত করছি (৪):

--------------------------------------------

(১) ইবনুন নাদিম: আল-ফিহরিস্ত, পৃষ্ঠা ৩৬।

(২) একই উৎস, পৃষ্ঠা ৩৯।

(৩) একই উৎস, পৃষ্ঠা ৩১।

(৪) একই উৎস, পৃষ্ঠা ৩৬ - ৪১।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ৯)
الكتب المؤلفة في تفسير القرآن: ذكر 14 كتابا.

الكتب المؤلفة في معاني القرآن ومشكله ومجازه: ذكر 25 كتابا.

الكتب المؤلفة في غريب القرآن: ذكر 14 كتابا.

الكتب المؤلفة في القراءات: ذكر 22 كتابا.

الكتب المؤلفة في الوقف والابتداء في القرآن: ذكر 12 كتابا.

الكتب المؤلفة في متشابه القرآن: ذكر 10 كتب.

الكتب المؤلفة في فضائل القرآن: ذكر 12 كتابا.

الكتب المؤلفة في عدد آي القرآن: ذكر 19 كتابا.

الكتب المؤلفة في ناسخ القرآن ومنسوخه: ذكر 18 كتابا.

الكتب المؤلفة في أحكام القرآن: ذكر 11 كتابا.

وتتميز هذه المرحلة بأن لكل علم من علوم القرآن كتبا خاصة به، فالكتاب الواحد لا يتناول إلا مباحث علم واحد، فلم تكن المؤلفات الجامعة قد ظهرت بعد.

 

‌‌المرحلة الثالثة: مرحلة المؤلفات الجامعة

خصص ابن النديم الفن الثالث من المقالة الأولى من كتابه الفهرست، لعلوم القرآن، وقال في مطلعه: «الفن الثالث: في نعت الكتاب الذي لا يأتيه الباطل من بين يديه ولا من خلفه تنزيل من حكيم حميد، وأسماء الكتب المصنفة في علومه، وأخبار القراء وأسماء رواتهم» (1). وما فعله ابن النديم هنا يمثل بداية اتجاه جديد للتأليف في علوم القرآن يتمثل بجمع خلاصة لعلوم القرآن كافة في مكان واحد، بعد أن كانت كتب علوم القرآن يختص كل كتاب منها بمباحث علم واحد. وأشهر الكتب التي اتبعت هذا المنهج:

--------------------------------------------

(1) المصدر نفسه ص 2، ويستغرق ذلك من كتاب الفهرست ص 27 - 42.
কুরআন তাফসীর (تفسير) বিষয়ে রচিত গ্রন্থাবলি: ১৪টি গ্রন্থের উল্লেখ করা হয়েছে।

কুরআনের মাআনি (معاني), মুশকিল (مشكل) এবং মাজায (مجاز) বিষয়ে রচিত গ্রন্থাবলি: ২৫টি গ্রন্থের উল্লেখ করা হয়েছে।

কুরআনের বিরল শব্দাবলি (غريب القرآن) বিষয়ে রচিত গ্রন্থাবলি: ১৪টি গ্রন্থের উল্লেখ করা হয়েছে।

কিরাত (القراءات) বিষয়ে রচিত গ্রন্থাবলি: ২২টি গ্রন্থের উল্লেখ করা হয়েছে।

কুরআনের ওয়াকফ (الوقف) এবং ইবতিদা (الابتداء) বিষয়ে রচিত গ্রন্থাবলি: ১২টি গ্রন্থের উল্লেখ করা হয়েছে।

কুরআনের মুতাশাবিহ (متشابه) আয়াতসমূহ বিষয়ে রচিত গ্রন্থাবলি: ১০টি গ্রন্থের উল্লেখ করা হয়েছে।

কুরআনের ফাজায়েল (فضائل) বিষয়ে রচিত গ্রন্থাবলি: ১২টি গ্রন্থের উল্লেখ করা হয়েছে।

কুরআনের আয়াত সংখ্যা বিষয়ে রচিত গ্রন্থাবলি: ১৯টি গ্রন্থের উল্লেখ করা হয়েছে।

কুরআনের নাসিখ (ناسخ) এবং মানসুখ (منسوخ) বিষয়ে রচিত গ্রন্থাবলি: ১৮টি গ্রন্থের উল্লেখ করা হয়েছে।

কুরআনের আহকাম (أحكام) বিষয়ে রচিত গ্রন্থাবলি: ১১টি গ্রন্থের উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পর্যায়ের বৈশিষ্ট্য হলো যে, উলূমুল কুরআনের (علوم القرآن) প্রতিটি শাস্ত্রের জন্য স্বতন্ত্র গ্রন্থ ছিল। একটি গ্রন্থ কেবল একটি বিষয়ের আলোচনাই অন্তর্ভুক্ত করত; তখন পর্যন্ত সমন্বিত রচনা (المؤلفات الجامعة) আত্মপ্রকাশ করেনি।

 

‌‌তৃতীয় পর্যায়: সমন্বিত রচনার (المؤلفات الجامعة) যুগ

ইবনুন নাদীম তাঁর আল-ফিহরিস্ট গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধের (المقالة) তৃতীয় অনুচ্ছেদটি (الفن) উলূমুল কুরআনের (علوم القرآن) জন্য নির্দিষ্ট করেছেন এবং এর প্রারম্ভে বলেছেন: «তৃতীয় অনুচ্ছেদ (الفن): সেই কিতাবের বর্ণনায় যাতে কোনো মিথ্যা আসতে পারে না, না সম্মুখ থেকে আর না পেছন থেকে, যা মহাজ্ঞানী ও চির প্রশংসিত সত্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ; আরও এর জ্ঞান বিজ্ঞানের ওপর রচিত গ্রন্থাবলির নাম এবং কারীদের (القراء) সংবাদ ও তাঁদের বর্ণনাকারীদের (رواتهم) নাম» (১)। এখানে ইবনুন নাদীম যা করেছেন, তা উলূমুল কুরআনের (علوم القرآن) রচনার ক্ষেত্রে একটি নতুন ধারার সূচনা হিসেবে গণ্য হয়। এই ধারাটি ছিল উলূমুল কুরআনের (علوم القرآن) সকল শাস্ত্রের সারসংক্ষেপ এক জায়গায় একত্রিত করার প্রচেষ্টা, অথচ এর আগে উলূমুল কুরআনের (علوم القرآن) প্রতিটি গ্রন্থ কেবল একটি নির্দিষ্ট শাস্ত্রের আলোচনার জন্য স্বতন্ত্র ছিল। এই পদ্ধতি অনুসরণকারী সর্বাধিক প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ হলো:

--------------------------------------------

(১) একই উৎস পৃষ্ঠা ২, এবং এটি আল-ফিহরিস্ট গ্রন্থের ২৭ থেকে ৪২ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বিস্তৃত।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ১০)
1 - كتاب فنون الأفنان في عجائب علوم القرآن، تأليف ابن الجوزي (أبو الفرج عبد الرحمن بن علي المتوفى سنة 597 هـ) (1).

2 - جمال القراء وكمال القراء، تأليف علم الدين السخاوي. (أبو الحسن علي بن محمد بن عبد الصمد المتوفى سنة 643 هـ) (2).

3 - المرشد الوجيز إلى علوم تتعلق بالكتاب العزيز، لأبي شامة المقدسي.

(أبو القاسم عبد الرحمن بن اسماعيل المتوفى سنة 665 هـ) (3).

4 - البرهان في علوم القرآن، تأليف بدر الدين الزركشي. (محمد بن عبد الله المتوفى سنة 794 هـ) (4).

5 - الإتقان في علوم القرآن، تأليف جلال الدين السيوطي (عبد الرحمن بن أبي بكر المتوفى سنة 911 هـ) (5).

وكتاب «الإتقان» هو أكبر كتاب في علوم القرآن، جمع فيه السيوطي خلاصة ثمانين مبحثا من مباحث علوم القرآن، استخلصها من المؤلفات السابقة له، وكان خاتمة للمؤلفات الجامعة في العصور المتقدمة.

 

‌‌المرحلة الرابعة: علوم القرآن في العصر الحديث:

عاد العلماء إلى التأليف في علوم القرآن في العصر الحديث، وتنوعت اتجاهات التأليف عندهم:

--------------------------------------------

(1) جزء واحد، حققه د. رشيد العبيدي، وطبع في بغداد سنة 1988 م. وكان قد حققه أحمد الشرقاوي إقبال، وطبع في الدار البيضاء سنة 1980 م.

(2) يقع في جزءين، حققه د. علي حسين البواب، وطبع في القاهرة سنة 1987 م.

(3) جزء واحد، حققه طيار آلتي قولاج، وطبع في بيروت سنة 1975 م.

(4) يقع في أربعة أجزاء، حققه محمد أبو الفضل إبراهيم وطبع في القاهرة ط 2 سنة 1972 م.

(5) يقع في أربعة أجزاء، حققه محمد أبو الفضل إبراهيم، وطبع في القاهرة سنة 1967 م.
1 - কিতাব ফুনুনুল আফনান ফি আজায়িব উলুমিল কুরআন, লেখক ইবনুল জাওজি (আবুল ফারাজ আবদুর রহমান বিন আলী, মৃত্যু ৫৯৭ হিজরি) (১)।

2 - জামালুল কুররা ওয়া কামালুল ইক্বরা, লেখক আলম উদ্দিন আস-সাখাবি। (আবুল হাসান আলী বিন মুহাম্মদ বিন আব্দুস সামাদ, মৃত্যু ৬৪৩ হিজরি) (২)।

3 - আল-মুরশিদ আল-ওয়াজিজ ইলা উলুমিন তাতাআল্লাকু বিল কিতাবিল আজিজ, লেখক আবু শামা আল-মাকদিসি।

(আবুল কাসিম আবদুর রহমান বিন ইসমাইল, মৃত্যু ৬৬৫ হিজরি) (৩)।

4 - আল-বুরহান ফি উলুমিল কুরআন, লেখক বদর উদ্দিন আজ-জারকাশি। (মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ, মৃত্যু ৭৯৪ হিজরি) (৪)।

5 - আল-ইতকান ফি উলুমিল কুরআন, লেখক জালাল উদ্দিন আস-সুয়ুতি (আবদুর রহমান বিন আবু বকর, মৃত্যু ৯১১ হিজরি) (৫)।

আর 'আল-ইতকান' কিতাবটি হলো উলুমুল কুরআনের ওপর রচিত সর্ববৃহৎ গ্রন্থ, যাতে সুয়ুতি উলুমুল কুরআনের আশিটি বিষয়ের সারসংক্ষেপ সংকলন করেছেন। তিনি এগুলো তাঁর পূর্ববর্তী রচনাবলি থেকে সংগ্রহ করেছেন এবং এটি ছিল পূর্ববর্তী যুগের সংকলিত গ্রন্থসমূহের পরিসমাপ্তি।

 

‌‌চতুর্থ পর্যায়: আধুনিক যুগে উলুমুল কুরআন:

আধুনিক যুগে আলেমগণ উলুমুল কুরআনের ওপর গ্রন্থ রচনায় পুনরায় আত্মনিয়োগ করেছেন এবং তাঁদের রচনার দৃষ্টিভঙ্গিতে বৈচিত্র্য এসেছে:

--------------------------------------------

(১) এক খণ্ড, এটি সম্পাদনা করেছেন ড. রশিদ আল-উবাইদি এবং ১৯৮৮ সালে বাগদাদে মুদ্রিত হয়েছে। আহমদ আশ-শারকাওয়ি ইকবালও এটি সম্পাদনা করেছিলেন এবং ১৯৮০ সালে কাসাব্লাঙ্কায় মুদ্রিত হয়েছিল।

(২) এটি দুই খণ্ডে বিভক্ত, সম্পাদনা করেছেন ড. আলী হুসাইন আল-বাওয়াব এবং ১৯৮৭ সালে কায়রোতে মুদ্রিত হয়েছে।

(৩) এক খণ্ড, সম্পাদনা করেছেন তাইয়্যার আলতি কুলাজ এবং ১৯৭৫ সালে বৈরুতে মুদ্রিত হয়েছে।

(৪) এটি চার খণ্ডে বিভক্ত, সম্পাদনা করেছেন মুহাম্মদ আবুল ফজল ইব্রাহিম এবং ১৯৭২ সালে কায়রোতে এর দ্বিতীয় সংস্করণ মুদ্রিত হয়েছে।

(৫) এটি চার খণ্ডে বিভক্ত, সম্পাদনা করেছেন মুহাম্মদ আবুল ফজল ইব্রাহিম এবং ১৯৬৭ সালে কায়রোতে মুদ্রিত হয়েছে।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ১১)
فمنهم من اتبع منهج المؤلفات الجامعة، مثل الشيخ طاهر الجزائري (ت 1920 م) في كتابه «التبيان لبعض المباحث المتعلقة بالقرآن»، الذي اختصر فيه بعض مباحث (الاتقان) للسيوطي. والشيخ محمد عبد العظيم الزرقاني (ت 1948 م) في كتابه «مناهل العرفان في علوم القرآن». ونحا هذا المنحى الدكتور صبحي الصالح في كتابه «مباحث في علوم القرآن» وغير هؤلاء كثير.

ومنهم من ألّف في علم واحد من علوم القرآن أو قضية من قضايا تأريخ القرآن، مثل كتاب «الظاهرة القرآنية» لمالك بن نبي، وكتاب «النبأ العظيم» للدكتور محمد عبد الله دراز، وكتاب «النسخ في القرآن» للدكتور مصطفى زيد، وكتاب «الإعجاز البياني للقرآن» للدكتورة عائشة عبد الرحمن، وكتاب «التفسير العلمي للآيات الكونية في القرآن» للأستاذ حنفي أحمد، وغيرها كثير أيضا.

وكان للمستشرقين دور في الدراسات الحديثة عن القرآن وعلومه، لكن أكثر تلك الدراسات كانت تنطلق من نظرة يشوبها التعصب (1)، وأشهر ما كتبوه كتاب «تاريخ القرآن» للمستشرق الألماني تيودور نولدكه، الذي صدرت طبعته الأولى سنة 1860 م، والذي قال عنه المستشرق آثر جفري: «وهو الآن أساس كل بحث في علوم القرآن في أوربا» (2)، وكتاب «مذاهب التفسير الإسلامي» للمستشرق المجري الأصل جولد تسهير (ت 1920 م) (3)، وكتاب «القرآن: نزوله، تدوينه، ترجمته وتأثيره» للمستشرق الفرنسي بلاشير (4).

ومن الكتب التي كتبها باحث غربي واتسمت بالموضوعية إلى حد كبير،

--------------------------------------------

(1) ينظر: مالك بن نبي، الظاهرة القرآنية ص 56.

(2) ص 4 من مقدمة تحقيقه كتاب المصاحف لابن أبي داود.

(3) ترجمه إلى العربية د. عبد الحليم النجار وطبع في مصر سنة 1955 م.

(4) ترجمه إلى العربية رضا سعادة، وطبع في بيروت سنة 1974 م.
তাদের মধ্যে কেউ কেউ সমন্বিত রচনার পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন, যেমন শায়খ তাহের আল-জাজাইরি (মৃত্যু ১৯২০ খ্রি.) তাঁর ‘আত-তিবইয়ান লি বা'দিল মাবাহিছিল মুতাআল্লিকতি বিল কুরআন’ গ্রন্থে, যেখানে তিনি সুয়ুতির ‘আল-ইতকান’ এর কিছু বিষয়ের সারসংক্ষেপ করেছেন। এবং শায়খ মুহাম্মদ আবদুল আজিম আজ-জারকানি (মৃত্যু ১৯৪৮ খ্রি.) তাঁর ‘মানাহিলুল ইরফান ফি উলুমিল কুরআন’ গ্রন্থে। ড. সুব্হি আস-সালিহ-ও তাঁর ‘মাবাহিছ ফি উলুমিল কুরআন’ গ্রন্থে এই পথ অনুসরণ করেছেন এবং এঁরা ছাড়াও আরও অনেকেই রয়েছেন।

আবার কেউ কেউ কুরআন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানের (علوم القرآن) কোনো একটি শাখা বা কুরআনের ইতিহাসের কোনো একটি বিষয় নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন। যেমন: মালিক বিন নবীর ‘আয-যাহিরাতুল কুরআনিয়াহ’, ড. মুহাম্মদ আবদুল্লাহ দরাজ-এর ‘আন-নাবাউল আজিম’, ড. মুস্তাফা জায়েদের ‘আন-নাসখ ফিল কুরআন’, ড. আয়েশা আবদুর রহমানের ‘আল-ই'জাযুল বায়ানি লিল কুরআন’ এবং উস্তাদ হানাফি আহমদের ‘আত-তাফসিরুল ইলমি লিল আয়াতিল কাওনিয়্যাহ ফিল কুরআন’ গ্রন্থসহ আরও অনেক কিতাব রয়েছে।

কুরআন এবং এর সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞান (علوم القرآن) নিয়ে আধুনিক গবেষণায় প্রাচ্যবিদদের ভূমিকা ছিল, তবে সে গবেষণার অধিকাংশেরই ভিত্তি ছিল পক্ষপাতদুষ্ট (১) দৃষ্টিভঙ্গি। তাদের রচিত গ্রন্থের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো জার্মান প্রাচ্যবিদ থিওডর নোলডেকে-এর ‘তারিখুল কুরআন’, যার প্রথম সংস্করণ ১৮৬০ সালে প্রকাশিত হয়। প্রাচ্যবিদ আর্থার জেফারি এটি সম্পর্কে বলেন: “এটি বর্তমানে ইউরোপে কুরআন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানের (علوم القرآن) সকল গবেষণার ভিত্তি” (২)। হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত প্রাচ্যবিদ গোল্ডজিহার (মৃত্যু ১৯২০ খ্রি.)-এর ‘মাজাহিবুত তাফসিরিল ইসলামি’ (৩) এবং ফরাসি প্রাচ্যবিদ ব্লাশারের ‘আল-কুরআন: নুযুলুহু, তাদউইনুহু, তারজামাতুহু ওয়া তা’ছিরুহু’ (৪)।

আর পশ্চিমা গবেষকদের লেখা বইগুলোর মধ্যে যা অনেকাংশেই বস্তুনিষ্ঠ ছিল—

--------------------------------------------

(১) দ্রষ্টব্য: মালিক বিন নবী, আয-যাহিরাতুল কুরআনিয়াহ, পৃষ্ঠা: ৫৬।

(২) ইবনে আবি দাউদ রচিত ‘কিতাবুল মাসাহিফ’-এর তাঁর করা সম্পাদনা (تحقيق)-র ভূমিকার ৪ নং পৃষ্ঠা।

(৩) ড. আবদুল হালিম আন-নাজ্জার এটি আরবিতে অনুবাদ করেন এবং ১৯৫৫ সালে মিসরে মুদ্রিত হয়।

(৪) রিদা সাআদাহ এটি আরবিতে অনুবাদ করেন এবং ১৯৭৪ সালে বৈরুতে মুদ্রিত হয়।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ১২)
كتاب «التوراة والإنجيل والقرآن والعلم» للكاتب الفرنسي موريس بوكاي (1)، الذي أراد في هذا الكتاب (اختبار الكتب المقدسة في ضوء المعارف العلمية الحديثة) (2)، والذي ختمه بقوله: «وبالنظر إلى حال المعارف في عصر محمد، لا نستطيع أن نفهم بأن كثيرا من الأخبار القرآنية التي لها سمة علمية يمكن أن تكون عمل إنسان، ولذلك فإن المشروع ليس بأن يعتبر القرآن تعبيرا لوحي فقط، بل بأن يعطى مركزا ممتازا لما يتمتع به من الأصالة الفريدة ولوجود أخبار علمية لديه ظهرت كتحد للتفسير الإنساني» (3).

إن التأليف في علوم القرآن في اتجاهيه العام والخاص لم ينقطع منذ بدئه إلى زماننا، وهو يعكس مقدار عناية الأمة بالقرآن الكريم، والحاجة الدائمة إلى مؤلفات توضح تأريخ النص القرآني، وتكشف عن وجوه إعجازه، وتبين ما يتضمنه من الحكمة ومعالم الهداية التي تتطلع إليها البشرية أفرادا وجماعات في جميع العصور.

--------------------------------------------

(1) ترجمه إلى العربية جماعة من الدعاة، ونشر في بيروت سنة 1978 م.

(2) ص 10 من الكتاب.

(3) ص 217 من الكتاب.
ফরাসি লেখক মরিস বুকাইলির (১) ‘তাওরাত, ইঞ্জিল, কুরআন ও বিজ্ঞান’ গ্রন্থটি, যাতে তিনি এই গ্রন্থে (আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের আলোকে পবিত্র গ্রন্থসমূহ পরীক্ষা করতে) (২) চেয়েছিলেন এবং যা তিনি এই বলে সমাপ্ত করেছেন: “মুহাম্মদের যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অবস্থা বিবেচনা করলে আমরা এটা বুঝতে সক্ষম নই যে, কুরআনের বহু সংবাদ—যার বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে—তা কোনো মানুষের কাজ হতে পারে। তাই লক্ষ্যটি কেবল কুরআনকে প্রত্যাদেশের (وحي) বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য করা নয়, বরং এর অনন্য মৌলিকত্ব এবং এতে বৈজ্ঞানিক তথ্যাবলির উপস্থিতির কারণে একে এক বিশেষ মর্যাদা প্রদান করা, যা মানবীয় ব্যাখ্যার মোকাবিলায় এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।” (৩)।

কুরআনের জ্ঞান (علوم القرآن) বিষয়ক সাধারণ ও বিশেষ উভয় ধারায় গ্রন্থ রচনার ধারা এর সূচনালগ্ন থেকে আমাদের সময় পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন রয়েছে। এটি পবিত্র কুরআনের প্রতি উম্মাহর গভীর যত্নের প্রতিফলন এবং কুরআনের মূল পাঠের ইতিহাস স্পষ্টকারী ও এর অলৌকিকত্বের (إعجاز) দিকসমূহ উন্মোচনকারী রচনার স্থায়ী প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। এছাড়াও তা কুরআনের প্রজ্ঞা (حكمة) ও হিদায়াতের (هداية) নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করে, যার প্রতি সকল যুগের মানুষ—ব্যক্তি ও সমাজ নির্বিশেষে—উন্মুখ হয়ে থাকে।

--------------------------------------------

(১) একদল দাঈ এটি আরবিতে অনুবাদ করেছেন এবং ১৯৭৮ সালে বৈরুতে প্রকাশিত হয়েছে।

(২) গ্রন্থের ১০ নং পৃষ্ঠা।

(৩) গ্রন্থের ২১৭ নং পৃষ্ঠা।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ১৩)
‌‌الفصل الأول نزول القرآن الكريم

‌‌المبحث الأول: مصدر القرآن

لقد علم الناس أجمعون علما لا يخالطه شك أن القرآن الكريم جاء على لسان رجل عربي أميّ ولد بمكة في القرن السادس الميلادي، اسمه محمد بن عبد الله بن عبد المطلب صلى الله عليه وسلم وأن البشرية لم تعرف هذا الكتاب إلا عن طريقه، لا خلاف في ذلك بين مؤمن وملحد، لأن شهادة التاريخ المتواترة لا يماثلها ولا يداخلها شهادته لكتاب غيره، ولا لحادث غيره ظهر على وجه الأرض. ولكن من أين جاء به محمد بن عبد الله صلى الله عليه وسلم، أمن عند نفسه ومن وحي ضميره، أم من عند معلّم؟ ومن هو ذلك المعلم (1)؟

إن الناس في الإجابة عن هذا السؤال ينقسمون إلى قسمين، قسم يعتقدون أن هذا الكتاب كلام الله تعالى أوحاه إلى نبيه محمد صلى الله عليه وسلم وقسم ينكرون ذلك ولكنهم كانوا متحيرين في نسبته إلى مصدر معين، وقد حكى القرآن الكريم أقاويل كفار مكة بشأن القرآن وردّ عليها ردا ساحقا، مؤكدا مصدره الإلهي.

قال الله تعالى: وَإِذا تُتْلى عَلَيْهِمْ آياتُنا بَيِّناتٍ قالُوا ما هذا إِلَّا رَجُلٌ يُرِيدُ أَنْ يَصُدَّكُمْ عَمَّا كانَ يَعْبُدُ آباؤُكُمْ وَقالُوا ما هذا إِلَّا إِفْكٌ مُفْتَرىً وَقالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلْحَقِّ لَمَّا جاءَهُمْ إِنْ هذا إِلَّا سِحْرٌ مُبِينٌ (43) [سبأ].

--------------------------------------------

(1) ينظر: محمد عبد الله دراز: النبأ العظيم ص 20.
প্রথম পরিচ্ছেদ: পবিত্র কুরআন অবতরণ

প্রথম অনুচ্ছেদ: কুরআনের উৎস

সকল মানুষ নিঃসংশয়ে এমন এক জ্ঞান রাখে যে, পবিত্র কুরআন এমন এক নিরক্ষর আরব ব্যক্তির মুখনিঃসৃত বাণী হিসেবে এসেছে যিনি ষষ্ঠ শতাব্দীতে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যাঁর নাম মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। মানবজাতি কেবল তাঁর মাধ্যমেই এই কিতাব সম্পর্কে জানতে পেরেছে। মুমিন ও নাস্তিক নির্বিশেষে এই বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কারণ ইতিহাসের অবিচ্ছিন্ন (متواترة) সাক্ষ্য অন্য কোনো কিতাব বা পৃথিবীর বুকে ঘটে যাওয়া অন্য কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে এমন অতুলনীয় ও অকাট্যভাবে পাওয়া যায় না। কিন্তু মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এটি কোথা থেকে নিয়ে এসেছেন? তাঁর নিজের পক্ষ থেকে এবং তাঁর হৃদয়ের অন্তস্থ অনুপ্রেরণা হিসেবে, নাকি কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে? আর কে সেই শিক্ষক (১)?

এই প্রশ্নের উত্তরে মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত। একদল বিশ্বাস করে যে, এই কিতাব মহান আল্লাহর বাণী যা তিনি তাঁর নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট প্রত্যাদেশ (وحي) করেছেন। অন্য দল এটি অস্বীকার করে, তবে তারা একে নির্দিষ্ট কোনো উৎসের দিকে নিসবত করার ব্যাপারে বিভ্রান্ত ছিল। পবিত্র কুরআন মক্কার কাফিরদের কুরআন সংক্রান্ত উক্তিগুলো বর্ণনা করেছে এবং সেগুলোর দাঁতভাঙ্গা জবাব প্রদান করে এর ঐশ্বরিক উৎসকে সুনিশ্চিত করেছে।

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: "আর যখন তাদের কাছে আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন তারা বলে, এ তো কেবল এমন এক ব্যক্তি যে তোমাদের পিতৃপুরুষরা যার ইবাদত করত তা থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে চায়। তারা আরও বলে, এটি একটি উদ্ভাবিত মিথ্যা বৈ নয়। আর সত্য যখন কাফিরদের কাছে আসল, তখন তারা সে সম্পর্কে বলল, এটি তো এক সুস্পষ্ট জাদু ছাড়া আর কিছুই নয়।" (সাবা: ৪৩)।

--------------------------------------------

(১) দ্রষ্টব্য: মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ দরাজ: আন-নাবাউল আজিম, পৃষ্ঠা ২০।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ১৪)
وقال تعالى: بَلْ قالُوا أَضْغاثُ أَحْلامٍ بَلِ افْتَراهُ بَلْ هُوَ شاعِرٌ فَلْيَأْتِنا بِآيَةٍ كَما أُرْسِلَ الْأَوَّلُونَ (5) ما آمَنَتْ قَبْلَهُمْ مِنْ قَرْيَةٍ أَهْلَكْناها أَفَهُمْ يُؤْمِنُونَ (6) وَما أَرْسَلْنا قَبْلَكَ إِلَّا رِجالًا نُوحِي إِلَيْهِمْ فَسْئَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لا تَعْلَمُونَ (7) وَما جَعَلْناهُمْ جَسَداً لا يَأْكُلُونَ الطَّعامَ وَما كانُوا خالِدِينَ (8) ثُمَّ صَدَقْناهُمُ الْوَعْدَ فَأَنْجَيْناهُمْ وَمَنْ نَشاءُ وَأَهْلَكْنَا الْمُسْرِفِينَ (9) لَقَدْ أَنْزَلْنا إِلَيْكُمْ كِتاباً فِيهِ ذِكْرُكُمْ أَفَلا تَعْقِلُونَ (10) [الأنبياء].

وقال تعالى: وَقالَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هَذا إِلَّا إِفْكٌ افْتَراهُ وَأَعانَهُ عَلَيْهِ قَوْمٌ آخَرُونَ فَقَدْ جاؤُ ظُلْماً وَزُوراً (4) وَقالُوا أَساطِيرُ الْأَوَّلِينَ اكْتَتَبَها فَهِيَ تُمْلى عَلَيْهِ بُكْرَةً وَأَصِيلًا (5) قُلْ أَنْزَلَهُ الَّذِي يَعْلَمُ السِّرَّ فِي السَّماواتِ وَالْأَرْضِ إِنَّهُ كانَ غَفُوراً رَحِيماً (6) وَقالُوا مالِ هذَا الرَّسُولِ يَأْكُلُ الطَّعامَ وَيَمْشِي فِي الْأَسْواقِ لَوْلا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مَلَكٌ فَيَكُونَ مَعَهُ نَذِيراً (7) [الفرقان].

وفي القرآن آيات أخرى حكت أقوال المشركين وبينت موقفهم من القرآن والدعوة الجديدة (1)، لكن القرآن بيّن في مقابل ذلك بيانا واضحا أن هذا القرآن من عند الله، وأنه وحي أوحاه الله إلى رسوله صلى الله عليه وسلم، كما أوحى إلى النبيين من قبله، قال تعالى: قُلْ ما كُنْتُ بِدْعاً مِنَ الرُّسُلِ وَما أَدْرِي ما يُفْعَلُ بِي وَلا بِكُمْ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا ما يُوحى إِلَيَّ وَما أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ مُبِينٌ (9) [الأحقاف]. وقال تعالى:* إِنَّا أَوْحَيْنا إِلَيْكَ كَما أَوْحَيْنا إِلى نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَوْحَيْنا إِلى إِبْراهِيمَ وَإِسْماعِيلَ وَإِسْحاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْباطِ وَعِيسى وَأَيُّوبَ وَيُونُسَ وَهارُونَ وَسُلَيْمانَ وَآتَيْنا داوُدَ زَبُوراً (163) وَرُسُلًا قَدْ قَصَصْناهُمْ عَلَيْكَ مِنْ قَبْلُ وَرُسُلًا لَمْ نَقْصُصْهُمْ عَلَيْكَ وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسى تَكْلِيماً (164) رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكانَ اللَّهُ عَزِيزاً حَكِيماً (165) لكِنِ اللَّهُ يَشْهَدُ بِما أَنْزَلَ إِلَيْكَ أَنْزَلَهُ بِعِلْمِهِ وَالْمَلائِكَةُ يَشْهَدُونَ وَكَفى بِاللَّهِ شَهِيداً (166) [النساء].

وبيّن القرآن أيضا أن الرسول صلى الله عليه وسلم ليس له في القرآن من عمل إلا الحفظ

--------------------------------------------

(1) ينظر: سورة الطور الآيات: 30 - 34، وسورة الحاقة الآيات: 39 - 52.
মহান আল্লাহ বলেন: “বরং তারা বলে, ‘এগুলো অলীক স্বপ্ন মাত্র; না, সে তা নিজে উদ্ভাবন করেছে; না, সে একজন কবি। সুতরাং সে আমাদের কাছে কোনো নিদর্শন নিয়ে আসুক, যেমন পূর্ববর্তীদের পাঠানো হয়েছিল।’ (৫) তাদের পূর্বে যে সব জনপদ আমরা ধ্বংস করে দিয়েছিলাম তারা ঈমান আনেনি; তবে কি এরা ঈমান আনবে? (৬) তোমার পূর্বে আমরা কেবল পুরুষদেরই পাঠিয়েছিলাম, যাদের কাছে আমরা ওহী (وحي) পাঠাতাম; সুতরাং তোমরা যদি না জানো তবে জ্ঞানীদের (أهل الذكر) জিজ্ঞাসা করো। (৭) আমরা তাদেরকে এমন দেহবিশিষ্ট করিনি যে তারা খাদ্য গ্রহণ করত না এবং তারা চিরস্থায়ীও ছিল না। (৮) অতঃপর আমরা তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলাম, ফলে আমরা তাদেরকে এবং যাদেরকে ইচ্ছা বাঁচিয়ে দিলাম আর সীমালঙ্ঘনকারীদের ধ্বংস করে দিলাম। (৯) অবশ্যই আমরা তোমাদের প্রতি এমন এক কিতাব অবতীর্ণ করেছি যাতে তোমাদের মর্যাদা রয়েছে; তবুও কি তোমরা বুঝবে না? (১০)” [আল-আম্বিয়া]।

মহান আল্লাহ বলেন: “আর কাফিররা বলে, ‘এটি মিথ্যা বৈ নয়, যা সে নিজে উদ্ভাবন করেছে এবং ভিন্ন এক সম্প্রদায় তাকে এ কাজে সাহায্য করেছে।’ নিশ্চয়ই তারা জুলুম ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। (৪) তারা আরও বলে, ‘এগুলো তো পূর্ববর্তীদের রূপকথা, যা সে লিখিয়ে নিয়েছে; এগুলো সকাল-সন্ধ্যায় তার কাছে পাঠ করা হয়।’ (৫) বলো, ‘যিনি আসমানসমূহ ও জমিনের রহস্য জানেন, তিনিই এটি অবতীর্ণ করেছেন; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (৬) তারা আরও বলে, ‘এ কেমন রাসুল যে আহার করে এবং হাটে-বাজারে চলাফেরা করে? কেন তার কাছে কোনো ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হলো না, যে তার সাথে সতর্ককারী হিসেবে থাকত?’ (৭)” [আল-ফুরকান]।

কুরআনের আরও অনেক আয়াত রয়েছে যেখানে মুশরিকদের বক্তব্য এবং কুরআন ও নতুন দাওয়াতের প্রতি তাদের অবস্থানের কথা বর্ণিত হয়েছে (১), কিন্তু এর বিপরীতে কুরআন স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে যে, এই কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং এটি একটি ওহী (وحي) যা আল্লাহ তাঁর রাসুলের (সা.) প্রতি অবতীর্ণ করেছেন, যেমনটি তিনি তাঁর পূর্ববর্তী নবীদের প্রতি ওহী (وحي) পাঠিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন: “বলো, ‘আমি রাসুলদের মধ্যে কোনো নতুন নই এবং আমি জানি না আমার সাথে বা তোমাদের সাথে কী আচরণ করা হবে। আমার প্রতি যা ওহী (يوحى) করা হয় আমি কেবল তারই অনুসরণ করি এবং আমি একজন স্পষ্ট সতর্ককারী বৈ নই’।” (৯) [আল-আহকাফ]। এবং মহান আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয়ই আমরা তোমার প্রতি ওহী (أوحينا) পাঠিয়েছি যেমন ওহী (أوحينا) পাঠিয়েছিলাম নূহ এবং তার পরবর্তী নবীদের প্রতি; আর আমরা ওহী (أوحينا) পাঠিয়েছিলাম ইব্রাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তার বংশধরগণ, ঈসা, আইয়ুব, ইউনুস, হারুন ও সুলায়মানের প্রতি; এবং দাউদকে আমরা যাবুর দান করেছিলাম। (১৬৩) আর আমরা এমন অনেক রাসুল পাঠিয়েছি যাদের কথা ইতিপূর্বে তোমার কাছে বর্ণনা করেছি এবং এমন অনেক রাসুল যাদের কথা তোমার কাছে বর্ণনা করিনি; আর আল্লাহ মূসার সাথে সরাসরি কথা বলেছেন। (১৬৪) রাসুলদের পাঠিয়েছি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে, যাতে রাসুলদের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অজুহাত না থাকে; আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (১৬৫) কিন্তু আল্লাহ যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছেন সে বিষয়ে তিনি নিজেই সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তিনি তা নিজ জ্ঞানে অবতীর্ণ করেছেন; এবং ফেরেশতারাও সাক্ষ্য দিচ্ছে, আর সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। (১৬৬)” [আন-নিসা]।

কুরআন আরও স্পষ্ট করেছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কুরআনের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ (الحفظ) ব্যতিরেকে অন্য কোনো ভূমিকা নেই।

--------------------------------------------

(১) দেখুন: সূরা আত-তূর, আয়াত: ৩০-৩৪, এবং সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত: ৩৯-৫২।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ১৫)
والتبليغ، قال الله تعالى: وَإِذا تُتْلى عَلَيْهِمْ آياتُنا بَيِّناتٍ قالَ الَّذِينَ لا يَرْجُونَ لِقاءَنَا ائْتِ بِقُرْآنٍ غَيْرِ هذا أَوْ بَدِّلْهُ قُلْ ما يَكُونُ لِي أَنْ أُبَدِّلَهُ مِنْ تِلْقاءِ نَفْسِي إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا ما يُوحى إِلَيَّ إِنِّي أَخافُ إِنْ عَصَيْتُ رَبِّي عَذابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ (15) قُلْ لَوْ شاءَ اللَّهُ ما تَلَوْتُهُ عَلَيْكُمْ وَلا أَدْراكُمْ بِهِ فَقَدْ لَبِثْتُ فِيكُمْ عُمُراً مِنْ قَبْلِهِ أَفَلا تَعْقِلُونَ (16) [يونس].

وقد أكدت آيات القرآن الكريم على أن الله تعالى هو الذي أنزل القرآن على سيدنا محمد صلى الله عليه وسلم، ونكتفي بإيراد أمثلة منها تذكّر القارئ بهذه الحقيقة الأساسية في العقيدة الإسلامية، فمنها:

قوله تعالى: اللَّهُ لا إِلهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ (2) نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقاً لِما بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنْزَلَ التَّوْراةَ وَالْإِنْجِيلَ (3) [آل عمران].

وَأَنْزَلْنا إِلَيْكَ الْكِتابَ بِالْحَقِّ … (48) [المائدة].

إِنَّا أَنْزَلْناهُ قُرْآناً عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ (2) [يوسف].

لَقَدْ أَنْزَلْنا إِلَيْكُمْ كِتاباً فِيهِ ذِكْرُكُمْ أَفَلا تَعْقِلُونَ (10) [الأنبياء].

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ تَنْزِيلًا (23) [الإنسان].

وإذا كانت الآيات الكريمة قد أكّدت على هذا المعنى فإن الأحاديث النبوية الشريفة قد أكدت عليه أيضا، فهذا رسول الله صلى الله عليه وسلم يعلن أن هذا القرآن الذي يتلوه على الناس ليس من تأليفه، وإنما هو وحي أوحاه الله عليه ليبلغه للناس، وأنه المعجزة الخالدة التي أيده الله تعالى بها، فمن ذلك قوله: «ما من الأنبياء نبيّ إلا أعطي من الآيات ما مثله آمن عليه البشر، وإنما كان الذي أوتيته وحيا أوحاه الله إليّ، فأرجو أن أكون أكثرهم تابعا يوم القيامة» (1). قال ابن حجر في شرحه:

--------------------------------------------

(1) رواه البخاري (فتح الباري 9/ 3)، وصحيح مسلم بشرح النووي 2/ 186.
এবং প্রচার। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: "যখন তাদের কাছে আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন যারা আমার সাথে সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না তারা বলে, 'এটি ছাড়া অন্য কোনো কুরআন নিয়ে এসো অথবা একে পরিবর্তন করো।' তুমি বলো, 'নিজের পক্ষ থেকে একে পরিবর্তন করা আমার কাজ নয়। আমার কাছে যে ওহী (وحي) পাঠানো হয়, আমি কেবল তারই অনুসরণ করি। আমি যদি আমার প্রতিপালকের অবাধ্য হই, তবে আমি অবশ্যই এক মহাদিবসের আজাবের ভয় করি।' (১৫) তুমি বলো, 'আল্লাহ চাইলে আমি তোমাদের কাছে এটি তিলাওয়াত করতাম না এবং তিনি তোমাদেরকে এ বিষয়ে জানাতেন না। ইতিপূর্বে আমি তোমাদের মাঝে দীর্ঘকাল অবস্থান করেছি; তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না?' (১৬)" [ইউনুস]।

কুরআনুল কারীমের আয়াতসমূহ একথার ওপর জোর দিয়েছে যে, আল্লাহ তাআলাই আমাদের নেতা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। ইসলামী আকিদাহর এই মৌলিক সত্যটি পাঠককে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য আমরা এর মধ্য থেকে কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করছি, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:

মহান আল্লাহর বাণী: "আল্লাহ, তিনি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। (২) তিনি সত্যসহ তোমার ওপর কিতাব নাযিল করেছেন, যা তার পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী; আর তিনি তাওরাত ও ইনজিল অবতীর্ণ করেছেন। (৩)" [আল-ইমরান]।

"এবং আমি তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি …" (৪৮) [আল-মায়েদাহ]।

"নিশ্চয়ই আমি একে আরবি কুরআন হিসেবে নাযিল করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।" (২) [ইউসুফ]।

"নিশ্চয়ই আমি তোমাদের প্রতি এমন এক কিতাব নাযিল করেছি যাতে তোমাদের জন্য উপদেশ রয়েছে; তবুও কি তোমরা বুঝবে না?" (১০) [আল-আম্বিয়া]।

"নিশ্চয়ই আমি তোমার ওপর পর্যায়ক্রমে কুরআন নাযিল করেছি।" (২৩) [আল-ইনসান]।

কুরআনুল কারীমের আয়াতসমূহ যেমন এই অর্থের ওপর জোর দিয়েছে, তেমনি পবিত্র হাদিসসমূহও এর ওপর জোর দিয়েছে। এই তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করছেন যে, তিনি মানুষের কাছে যে কুরআন তিলাওয়াত করেন তা তাঁর নিজস্ব রচনা নয়, বরং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ওহী (وحي) যা আল্লাহ তাঁর প্রতি অবতীর্ণ করেছেন যেন তিনি তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। আর এটিই সেই চিরন্তন অলৌকিক নিদর্শন (معجزة) যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁকে সাহায্য করেছেন। তাঁর বাণীর মধ্যে রয়েছে: "নবীগণের (الأنبياء) মধ্যে এমন কোনো নবী (نبي) ছিলেন না যাকে এমন কিছু নিদর্শন (الآيات) প্রদান করা হয়নি যার ওপর মানুষ ঈমান এনেছে। আর আমাকে যা প্রদান করা হয়েছে তা হলো ওহী (وحي) যা আল্লাহ আমার প্রতি অবতীর্ণ করেছেন। অতএব আমি আশা করি যে, কিয়ামতের দিন অনুসারীর সংখ্যায় আমি তাদের সবার চেয়ে বেশি হব।" (১)। ইবনে হাজার তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থ (شرح)-এ বলেছেন:

--------------------------------------------

(১) এটি ইমাম বুখারি বর্ণনা করেছেন (ফাতহুল বারি ৯/৩), এবং ইমাম নববীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ (شرح) সহ সহিহ মুসলিম ২/১৮৬।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ১৬)
«أي أن معجزتي التي تحدّيت بها هي الوحي الذي أنزل عليّ، وهو القرآن، لما اشتمل عليه من الإعجاز الواضح … » (1).

وقال رسول الله صلى الله عليه وسلم أيضا: «ألا إني أوتيت الكتاب ومثله معه … » (2).

يعني بالكتاب القرآن، ومثله يعني السنة. والأحاديث في هذا المعنى كثيرة تؤكد على أن القرآن لم يصدر عن الرسول صلى الله عليه وسلم ابتداء، وإنما أنزل عليه، وأنه كلام الله تعالى. وقد آمن بهذه الحقيقة أجيال المسلمين من لدن عصر الصحابة، ولا تزال هذه الحقيقة هي الركيزة الأساسية لإيمان المؤمنين، لا يحيد عنها إلا هالك.

 

‌‌المبحث الثاني بدء نزول القرآن

إن من يريد أن يتعرف على بدء الظاهرة القرآنية فعليه أن يدرس البيئة التي ظهرت فيها، فإن القرآن وإن لم يكن من صنع تلك البيئة فإن كثيرا من معانيه لا تفهم إلا بمعرفتها، كما أن دراسة سيرة الرجل الذي نزل عليه القرآن ضرورة لتفهم كيفية نزول القرآن وإدراك حقيقة الدعوة التي تضمنها. ولا يتسع المكان لعرض تلك التفاصيل هنا، ونفترض أن القارئ على معرفة مناسبة لها. ونكتفي بنقل قول محمد بن سعد الذي يلخص فيه معالم شخصية النبي صلى الله عليه وسلم قبل البعثة، حيث قال: «شبّ رسول الله صلى الله عليه وسلم مع أبي طالب، يكلؤه الله ويحفظه ويحوطه من أمور الجاهلية ومعايبها، لما يريد به من كرامته، وهو على دين قومه، حتى بلغ أن كان رجلا أفضل قومه مروءة، وأحسنهم خلقا، وأكرمهم مخالطة، وأحسنهم جوارا، وأعظمهم حلما وأمانة، وأصدقهم حديثا، وأبعدهم من الفحش والأذى،

--------------------------------------------

(1) فتح الباري 9/ 6.

(2) رواه أبو داود في سننه 4/ 200.
«অর্থাৎ, আমার সেই মুজিজা (معجزة) যার মাধ্যমে আমি চ্যালেঞ্জ করেছি, তা হলো আমার প্রতি অবতীর্ণ ওহি (وحي), আর তা হলো কুরআন; কারণ এটি সুস্পষ্ট অলৌকিকত্ব (إعجاز) ধারণ করে আছে … » (১)।

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন: «জেনে রেখো, আমাকে কিতাব এবং তার সাথে তার অনুরূপ কিছু প্রদান করা হয়েছে … » (২)।

এখানে কিতাব বলতে কুরআনকে বোঝানো হয়েছে, আর 'তার অনুরূপ' বলতে সুন্নাহ (السنة)-কে বোঝানো হয়েছে। এই মর্মার্থে হাদিসসমূহ অনেক যা নিশ্চিত করে যে, কুরআন মূলত রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে উৎসারিত হয়নি, বরং তা তাঁর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং তা মহান আল্লাহর বাণী (كلام الله)। সাহাবীগণের যুগ থেকে মুসলিমদের সকল প্রজন্ম এই সত্যে বিশ্বাস স্থাপন করে আসছে এবং এই সত্যটি মুমিনদের ঈমানের মূল ভিত্তি হয়ে রয়েছে, যা থেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ বিচ্যুত হয় না।

 

‌‌দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: কুরআন অবতরণ শুরু হওয়া

যে ব্যক্তি কুরআনিক বিষয়ের সূচনা সম্পর্কে জানতে চান, তাঁকে অবশ্যই সেই পরিবেশ সম্পর্কে অধ্যয়ন করতে হবে যেখানে এটি প্রকাশিত হয়েছে। যদিও কুরআন সেই পরিবেশের সৃষ্টি নয়, তবুও এর অনেক অর্থ সেই পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়। তেমনিভাবে যাঁর ওপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে সেই মহান ব্যক্তির জীবনী (سيرة) অধ্যয়ন করা কুরআন অবতরণের ধরণ বুঝতে এবং এতে অন্তর্ভুক্ত দাওয়াতের (دعوة) প্রকৃত স্বরূপ অনুধাবন করতে অপরিহার্য। এখানে সেই বিস্তারিত বিবরণের অবকাশ নেই এবং আমরা ধরে নিচ্ছি যে পাঠকের এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান রয়েছে। আমরা কেবল মুহাম্মাদ ইবনে সা'দ-এর উক্তিটি উদ্ধৃত করেই ক্ষান্ত হচ্ছি যাতে তিনি নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন: «রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবু তালিবের সান্নিধ্যে বড় হয়েছেন; আল্লাহ তাআলা তাঁকে রক্ষা করতেন এবং জাহেলি যুগের যাবতীয় কলুষতা ও দোষত্রুটি থেকে হিফাজত করতেন; কারণ আল্লাহ তাঁকে সম্মানিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি তাঁর কওমের ধর্মের ওপরই ছিলেন, যতক্ষণ না তিনি তাঁর কওমের মধ্যে পৌরুষত্বে (مروءة) শ্রেষ্ঠ, চরিত্রে সর্বোত্তম, মেলামেশায় সবচেয়ে সম্মানিত, আচার-আচরণে শ্রেষ্ঠ প্রতিবেশী, সহনশীলতায় (حلم) মহানতম, আমানতদারিতায় (أمانة) শ্রেষ্ঠ, কথায় সবচেয়ে সত্যবাদী এবং অশ্লীলতা ও কষ্টদায়ক আচরণ থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থানকারী ব্যক্তিতে পরিণত হলেন।

--------------------------------------------

(১) ফাতহুল বারী ৯/৬।

(২) আবু দাউদ তাঁর সুনানে এটি বর্ণনা (رواية) করেছেন ৪/২০০।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ১৭)
وما رئي ملاحيا ولا مماريا أحدا، حتى سماه قومه الأمين، لما جمع الله له من الأمور الصالحة، فقد كان الغالب عليه بمكة الأمين» (1).

وفي السنة التي بلغ فيها النبي صلى الله عليه وسلم الأربعين من عمره بدأ تحول كبير في حياته لم يكن قد تهيأ له من قبل، لكن العناية الإلهية كانت ترعى ذلك التحول وتوجهه نحو النبوة الكاملة التي تنكشف فيها حجب الغيب، ويتنزل الوحي بالقرآن عليه. وكانت أولى مظاهر ذلك التحول أن النبي صلى الله عليه وسلم قال لخديجة، رضي الله عنها: «إني أرى ضوءا وأسمع صوتا» (2). وتتابعت إرهاصات النبوة التي انتهت باللقاء الأول بين رسول الله صلى الله عليه وسلم والملك جبريل عليه السلام الذي حمل الرسالة إليه.

وتقدّم الروايات التاريخية والأحاديث الصحيحة وصفا لبدء نزول القرآن على رسول الله صلى الله عليه وسلم، ونقل البخاري في كتابه الجامع الصحيح، كما جاء في غيره من المصادر المعتمدة تفاصيل ذلك الحدث العظيم عن عائشة، رضي الله عنها، حيث قالت (3): «كان أوّل ما بدئ به رسول الله صلى الله عليه وسلم من الوحي الرؤيا الصادقة (أو الصالحة) في النوم، فكان لا يرى رؤيا إلا جاءت مثل فلق الصبح.

قالت: فمكث على ذلك ما شاء الله، وحبّب إليه الخلوة، فلم يكن شيء أحبّ إليه منها، وكان يخلو بغار حراء (4) فيتحنث فيه- وهو التعبد- الليالي ذوات العدد، قبل أن يرجع إلى أهله فيتزود لمثلها، حتى فجئه الحق وهو في غار حراء.

--------------------------------------------

(1) الطبقات الكبرى 1/ 121.

(2) رواه الإمام أحمد في المسند (1/ 312) عن ابن عباس، وينظر: الهيثمي: مجمع الزوائد 8/ 255.

(3) البخاري: الجامع الصحيح 1/ 5. وينظر: ابن سعد: الطبقات الكبرى 1/ 194، وابن هشام: السيرة النبوية 1/ 234، وعبد الرزاق: المصنف 5/ 321، وصحيح مسلم بشرح النووي 2/ 197.

(4) حراء: بالمد وكسر الحاء، جبل من جبال مكة على ثلاثة أميال منها، في أعلاه قمة شامخة، وفيه الغار الذي كان يأوي إليه رسول الله صلى الله عليه وسلم.
তাকে কখনো ঝগড়াটে বা বিতর্ককারী হিসেবে দেখা যায়নি, এমনকি তাঁর কওম তাঁকে বিশ্বস্ত (الأמין) বলে ডাকত। আল্লাহ তাআলা তাঁর মাঝে সমস্ত নেক গুণাবলি একত্রিত করে দিয়েছিলেন, তাই মক্কায় তিনি 'আল-আমিন' হিসেবেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। (১)

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন তাঁর জীবনের চল্লিশ বছর পূর্ণ করলেন, তখন তাঁর জীবনে এক বিশাল পরিবর্তনের সূচনা হলো যা আগে কখনো তাঁর সামনে আসেনি। তবে ঐশী তত্ত্বাবধান সেই পরিবর্তনকে পরিচালনা করছিল এবং তাঁকে পূর্ণ নবুওয়াতের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, যেখানে অদৃশ্যের পর্দা উন্মোচিত হয় এবং তাঁর ওপর কুরআনের ওহি অবতীর্ণ হয়। সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণ ছিল এই যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-কে বলেছিলেন: "আমি আলোকচ্ছটা দেখি এবং শব্দ শুনতে পাই" (২)। এরপর নবুওয়াতের প্রারম্ভিক নিদর্শনাবলি একে একে প্রকাশ পেতে থাকে এবং সবশেষে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও ফেরেশতা জিবরাইল (আলাইহিস সালাম)-এর প্রথম সাক্ষাতের মাধ্যমে তা পূর্ণতা পায়, যিনি তাঁর নিকট রিসালাত নিয়ে এসেছিলেন।

ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং সহিহ (صحيح) হাদিসসমূহ আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সূচনার বর্ণনা প্রদান করে। ইমাম বুখারি তাঁর গ্রন্থ আল-জামি আস-সহিহ-এ এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য (معتمدة) উৎসসমূহে এই মহান ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণনা করেছেন, যেখানে তিনি বলেছেন (৩): "রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর ওহি শুরুর প্রথম মাধ্যম ছিল ঘুমের মধ্যে সত্য (صادقة) [অথবা নেক (صالحة)] স্বপ্ন। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন, তা ভোরের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে প্রকাশিত হতো।

তিনি বলেন: আল্লাহ যতক্ষণ চাইলেন তিনি এ অবস্থায় থাকলেন। এরপর তাঁর কাছে নির্জনতা প্রিয় হয়ে উঠল, তাঁর কাছে নির্জনবাসের চেয়ে প্রিয় আর কিছু ছিল না। তিনি হেরা গুহায় (৪) নির্জনে অবস্থান করতেন এবং সেখানে টানা বেশ কয়েক রাত 'তাহান্নুস'—অর্থাৎ ইবাদতে—নিমগ্ন থাকতেন। এরপর তিনি পরিবারের কাছে ফিরে আসতেন এবং অনুরূপ সময়ের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করে নিয়ে যেতেন। এভাবে চলতে চলতে হেরা গুহায় থাকা অবস্থায় হঠাৎ তাঁর কাছে সত্যের (ওহি) আগমন ঘটল।

--------------------------------------------

(১) আত-তবাকাতুল কুবরা ১/১২১।

(২) ইমাম আহমদ মুসনাদ (১/৩১২) গ্রন্থে ইবনে আব্বাস থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। দ্রষ্টব্য: আল-হাইসামি: মাজমাউয যাওয়াইদ ৮/২৫৫।

(৩) বুখারি: আল-জামি আস-সহিহ ১/৫। আরও দেখুন: ইবনে সাদ: আত-তবাকাতুল কুবরা ১/১৯৪, ইবনে হিশাম: আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ ১/২৩৪, আবদুর রাজ্জাক: আল-মুসান্নাফ ৫/৩২১ এবং শারহে নববীসহ সহিহ মুসলিম ২/১৯৭।

(৪) হেরা: 'হা' বর্ণে কাসরা এবং 'রা' বর্ণে মাদ্দসহ; এটি মক্কার একটি পাহাড় যা মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত। এর চূড়াটি অনেক উঁচুতে এবং এখানেই সেই গুহাটি অবস্থিত যেখানে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অবস্থান করতেন।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ১৮)
فجاءه الملك فقال: اقرأ، قال: ما أنا بقارئ، قال: فأخذني فغطّني (1) حتى بلغ مني الجهد، ثم أرسلني، فقال: أقرأ، قلت: ما أنا بقارئ، فأخذني فغطني الثانية حتى بلغ مني الجهد، ثم أرسلني، فقال: اقرأ، فقلت ما أنا بقارئ، فأخذني فغطني الثالثة ثم أرسلني، فقال: اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ (1) خَلَقَ الْإِنْسانَ مِنْ عَلَقٍ (2) اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ (3)

الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ (4) عَلَّمَ الْإِنْسانَ ما لَمْ يَعْلَمْ (5)

[العلق].

فرجع بها الرسول صلى الله عليه وسلم يرجف فؤاده، فدخل على خديجة بنت خويلد، رضي الله عنها، فقال: زمّلوني (2)، حتى ذهب عنه الرّوع، فقال لخديجة وأخبرها الخبر: لقد خشيت على نفسي، فقالت خديجة: كلا، والله ما يخزيك الله أبدا، إنك لتصل الرّحم، وتحمل الكلّ، وتكسب المعدوم، وتقري الضيف، وتعين على نوائب الحق.

فانطلقت به خديجة حتى أتت به ورقة بن نوفل بن أسد بن عبد العزى، ابن عم خديجة، كان امرأ تنصّر في الجاهلية، وكان يكتب الكتاب العبراني، فيكتب من الإنجيل بالعبرانية ما شاء أن يكتب (3). وكان شيخا كبيرا قد عمي، فقالت له خديجة: يا ابن عم، اسمع من ابن أخيك، فقال له ورقة: يا ابن أخي ماذا ترى؟

فأخبره رسول الله صلى الله عليه وسلم خبر ما رأى، فقال له ورقة: هذا الناموس (4) الذي نزّل الله على موسى، يا ليتني فيها جذعا، ليتني أكون حيا إذ يخرجك قومك، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: أو مخرجيّ هم؟ قال: نعم، لم يأت رجل قط بمثل ما جئت به إلا عودي، وإن يدركني يومك أنصرك نصرا مؤزرا، ثم لم ينشب (5) ورقة أن توفي، وفتر الوحي».

--------------------------------------------

(1) الغط: العصر الشديد (ينظر: ابن الأثير: النهاية 3/ 373).

(2) زملوني: دثّروني وغطّوني (ابن الأثير: النهاية 2/ 313).

(3) كان ورقة يكتب بالعربية كما كان يكتب بالعبرانية (ابن حجر: فتح الباري 1/ 25).

(4) الناموس: صاحب سر الوحي، والمراد به جبريل، عليه السلام. (ابن منظور: لسان العرب 8/ 130 نمس).

(5) لم ينشب: لم يلبث (ابن الأثير: النهاية 5/ 52).
অতঃপর ফেরেশতা তাঁর নিকট আগমন করলেন এবং বললেন: 'পাঠ করুন'। তিনি বললেন: 'আমি তো পাঠকারী নই'। তিনি (রাসূলুল্লাহ সা.) বলেন: 'তখন তিনি আমাকে জাপটে ধরলেন এবং প্রবলভাবে চাপ দিলেন (الغط) (১), এমনকি তা আমার কষ্টের চরম সীমায় পৌঁছে গেল। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন: 'পাঠ করুন'। আমি বললাম: 'আমি তো পাঠকারী নই'। তিনি পুনরায় দ্বিতীয়বার আমাকে জাপটে ধরলেন এবং প্রবলভাবে চাপ দিলেন, এমনকি তা আমার কষ্টের চরম সীমায় পৌঁছে গেল। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন: 'পাঠ করুন'। আমি বললাম: 'আমি তো পাঠকারী নই'। অতঃপর তিনি তৃতীয়বার আমাকে জাপটে ধরলেন এবং প্রবলভাবে চাপ দিলেন। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন: 'পাঠ করুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন (১), সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে (২), পাঠ করুন এবং আপনার রব মহিমান্বিত (৩)।'

'যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন (৪), শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না (৫)।'

[সূরা আল-আলাক]।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই ওহী নিয়ে কম্পিত হৃদয়ে ফিরে এলেন। তিনি খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রাদিয়াল্লাহু আনহার নিকট প্রবেশ করে বললেন: 'তোমরা আমাকে বস্ত্রাবৃত কর (زملوني) (২), তোমরা আমাকে বস্ত্রাবৃত কর'। অবশেষে তাঁর আতঙ্ক দূর হলো। তিনি খাদিজাকে সব ঘটনা জানিয়ে বললেন: 'আমি নিজের ব্যাপারে আশঙ্কা করছি'। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন: 'কখনো নয়! আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনো লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, অক্ষমদের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বদের জন্য উপার্জনের ব্যবস্থা করেন, মেহমানদারি করেন এবং সত্যের পথে আপতিত বিপদে সাহায্য করেন'।

অতঃপর খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁকে নিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই ওরাকা ইবনে নওফেল ইবনে আসাদ ইবনে আব্দুল উযযার নিকট গেলেন। তিনি জাহেলিয়াত যুগে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হিব্রু কিতাব লিখতেন এবং হিব্রু ভাষায় ইনজিল থেকে যতটুকু আল্লাহ চাইতেন ততটুকু লিপিবদ্ধ করতেন (৩)। তিনি তখন অত্যন্ত বৃদ্ধ এবং দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েছিলেন। খাদিজা তাঁকে বললেন: 'হে চাচাতো ভাই! আপনার ভাতিজার কথা শুনুন'। ওরাকা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন: 'ভাতিজা! তুমি কী দেখছো?'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা দেখেছিলেন তা সবিস্তারে তাঁকে জানালেন। তখন ওরাকা তাঁকে বললেন: 'ইনি তো সেই বার্তাবাহক (الناموس) (৪) যাকে আল্লাহ মুসা আলাইহিস সালামের নিকট পাঠিয়েছিলেন। হায়! আমি যদি সেদিন যুবক থাকতাম! হায়! আমি যদি সেদিন জীবিত থাকতাম যেদিন আপনার কওম আপনাকে বের করে দেবে'। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'তবে কি তারা আমাকে বের করে দেবে?' তিনি বললেন: 'হ্যাঁ, আপনি যা নিয়ে এসেছেন এর অনুরূপ কিছু নিয়ে যখনই কোনো ব্যক্তি এসেছেন, তাঁর সাথেই শত্রুতা করা হয়েছে। যদি আমি আপনার সেই দিনটি পাই, তবে আপনাকে সর্বাত্মকভাবে সাহায্য করব'। এরপর বেশি সময় অতিবাহিত হয়নি (لم ينشب) (৫), ওরাকা মৃত্যুবরণ করলেন এবং ওহী সাময়িকভাবে স্থগিত (فتر الوحي) হয়ে গেল।

--------------------------------------------

(১) আল-গাত (الغط): অত্যন্ত শক্তভাবে জাপটে ধরা বা চাপ দেওয়া (দ্রষ্টব্য: ইবনুল আসির: আন-নিহায়া ৩/৩৭৩)।

(২) যাম্মিলুনী (زملوني): আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর এবং ঢেকে দাও (ইবনুল আসির: আন-নিহায়া ২/৩১৩)।

(৩) ওরাকা যেমন আরবিতে লিখতেন, তেমনি হিব্রু ভাষাতেও লিখতেন (ইবনে হাজার: ফাতহুল বারি ১/২৫)।

(৪) আন-নামুস (الناموس): ওহীর গোপন রহস্য রক্ষাকারী, আর এখানে উদ্দেশ্য হলো জিবরাইল আলাইহিস সালাম (ইবনে মানজুর: লিসানুল আরব ৮/১৩০, নামাসা)।

(৫) লাম ইয়ানশাব (لم ينشب): বিলম্ব করেনি বা দেরি হয়নি (ইবনুল আসির: আন-নিহায়া ৫/৫২)।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ১৯)
قال ابن سعد: «نزل الملك على رسول الله صلى الله عليه وسلم بحراء، يوم الاثنين، لسبع عشرة خلت من شهر رمضان (1)، ورسول الله يومئذ ابن أربعين سنة، وجبريل الذي كان ينزل عليه بالوحي» (2).

وقد قال الله تعالى: شَهْرُ رَمَضانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدىً لِلنَّاسِ وَبَيِّناتٍ مِنَ الْهُدى وَالْفُرْقانِ (185) [البقرة].

 

المبحث الثالث فتور (3) الوحي

إن الارتقاء إلى مقام النبوة الذي تنكشف معه حجب الغيب، ويتصل الإنسان فيه بعالم الروح- أمر يستدعي كثيرا من الإعداد النفسي الذي ينقل الإنسان إلى ذلك المقام من غير أن يصاب بانهيار نفسي أو اضطراب عقلي. ويلمس المتأمل جوانب ذلك الإعداد الإلهي في حياة النبي محمد صلى الله عليه وسلم متمثلة بأمور عدة منها:

1 - ما رآه وسمعه من الضوء والصوت غير المألوف له من قبل.

2 - الرؤيا الصادقة التي صارت تتكرر وتتحقق مما يخرج عن العادة.

3 - الميل نحو الخلوة، وتفرغه لها في أعلى جبل حراء، وما توحيه تلك الخلوة في ليلها الساجي الساكن ونهارها الضاحي الطويل من شعور.

4 - ما لقيه صلى الله عليه وسلم من الضم الشديد من الملك في اللقاء الأول، لإعداده لتحمل الثقل المصاحب لإيحاء القرآن إليه.

--------------------------------------------

(1) يقابل ذلك شهر شباط من سنة 610 من التقويم الميلادي (ينظر: محمد عبد الله دراز:

مدخل إلى القرآن الكريم ص 28).

(2) الطبقات الكبرى: 1/ 194.

(3) فتور الوحي: انقطاع نزول جبريل على النبي صلى الله عليه وسلم مدة بعد نزوله عليه في غار حراء.
ইবনে সাদ বলেন: "সোমবার, রমজান মাসের সতেরো তারিখ অতিবাহিত হওয়ার পর হেরা গুহায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট ফেরেশতা অবতীর্ণ হলেন (১)। সেদিন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বয়স ছিল চল্লিশ বছর, আর জিবরাঈলই তাঁর নিকট ওহি (وحي) নিয়ে আসতেন" (২)।

আর আল্লাহ তাআলা বলেছেন: "রমজান মাসই সেই মাস, যাতে কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথনির্দেশ ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী (الفرقان)" (১৮৫) [আল-বাকারা]।

 

তৃতীয় পরিচ্ছেদ: ওহি (وحي) স্থগিত থাকা (فتور) (৩)

নবুওয়তের (النبوة) সেই সুউচ্চ মর্যাদায় আরোহণ করা—যেখানে অদৃশ্যের (الغيب) পর্দা উন্মোচিত হয় এবং মানুষ রুহানি জগতের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়—এমন একটি বিষয় যার জন্য প্রচুর মানসিক প্রস্তুতির প্রয়োজন। এই প্রস্তুতি মানুষকে সেই মর্যাদায় এমনভাবে পৌঁছে দেয় যেন সে কোনো মানসিক বিপর্যয় বা মানসিক অস্থিরতার শিকার না হয়। কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে সেই ঐশী প্রস্তুতির দিকগুলো বিভিন্ন বিষয়ের মাধ্যমে লক্ষ্য করতে পারেন, যার মধ্যে রয়েছে:

১ - ইতোপূর্বে তাঁর কাছে অপরিচিত ছিল এমন আলো ও শব্দ যা তিনি দেখেছিলেন এবং শুনেছিলেন।

২ - সত্য স্বপ্ন (الرؤيا الصادقة), যা বারবার দেখা যেত এবং যা অলৌকিকভাবে বাস্তবায়িত হতো।

৩ - নির্জনতার (الخلوة) প্রতি ঝোঁক এবং হেরা পাহাড়ের চূড়ায় এর জন্য নিজেকে নিবেদিত করা; আর সেই নিস্তব্ধ-শান্ত রাত এবং প্রলম্বিত উজ্জ্বল দিনের নির্জনতা মনে যে অনুভূতির উদ্রেক করে।

৪ - প্রথম সাক্ষাতে ফেরেশতা কর্তৃক তাঁকে সজোরে আলিঙ্গন করা, যাতে তাঁর মধ্যে কুরআনের ওহি (وحي) অবতরণের সাথে সংশ্লিষ্ট গুরুভার বহন করার প্রস্তুতি তৈরি হয়।

--------------------------------------------

(১) এটি খ্রিষ্টীয় ৬১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের সাথে মিলে যায় (দেখুন: মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ দাররাজ: মাদখাল ইলাল কুরআনিল কারিম, পৃষ্ঠা ২৮)।

(২) আত-তাবাকাতুল কুবরা: ১/ ১৯৪।

(৩) ওহি স্থগিত থাকা (فتور الوحي): হেরা গুহায় জিবরাঈলের অবতীর্ণ হওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নবী (সা.)-এর নিকট তাঁর ওহি (وحي) নিয়ে আসা বন্ধ থাকা।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ২০)
وقد كان رسول الله صلى الله عليه وسلم بعد ذلك اللقاء المبارك في غار حراء في حاجة إلى وقت للراحة والتأمل في حقيقة هذا الأمر الجديد في حياته، وتحقق ذلك بانقطاع نزول جبريل عليه مدة من الوقت جعلته يتشوق إلى لقائه مرة أخرى، بعد أن زال عنه الرّوع، وأخذ يتفكر في كلمات ورقة بن نوفل الذي لم يلبث أن توفي بعد أن سمع منه تفسيره لما وقع له في غار حراء، فروى ابن سعد عن عبد الله بن عباس «أن رسول الله صلى الله عليه وسلم لمّا نزل عليه الوحي بحراء مكث أياما لا يرى جبريل، فحزن حزنا شديدا، حتى كان يغدو إلى ثبير (1) مرة وإلى حراء مرة، يريد أن يلقي نفسه منه، فبينا رسول الله صلى الله عليه وسلم كذلك عامدا لبعض تلك الجبال إذ سمع صوتا من السماء. فوقف رسول الله صلى الله عليه وسلم صعقا للصوت، ثم رفع رأسه، فإذا جبريل يقول:

يا محمد أنت رسول الله حقا، وأنا جبريل، قال: فانصرف رسول الله صلى الله عليه وسلم وقد أقرّ الله عينه، وربط جأشه، ثم تتابع الوحي بعد وحمي» (2).

ونقل البخاري الرواية بتفصيل آخر عن جابر بن عبد الله الأنصاري «قال وهو يحدّث عن فترة الوحي، فقال في حديثه: بينا أنا أمشي إذ سمعت صوتا من السماء، فرفعت بصري، فإذا الملك الذي جاءني بحراء جالس على كرسي بين السماء والأرض، فرعبت منه، فرجعت فقلت: زمّلوني، فدثّروه، فأنزل الله يا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ (1) قُمْ فَأَنْذِرْ (2) وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ (3) وَثِيابَكَ فَطَهِّرْ (4) وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ (5) [المدثر]، ثم تتابع الوحي» (3).

وهكذا ذهب في هذه الفترة ما وجده رسول الله صلى الله عليه وسلم من الرّوع في لقاء غار حراء، وكذلك تشوّق، بعد ذهاب الرّوع عنه، إلى رؤية الملك مرة أخرى (4).

--------------------------------------------

(1) ثبير: جبل من جبال مكة. (ينظر: صفي الدين البغدادي: مراصد الاطلاع 1/ 292).

(2) الطبقات الكبرى 1/ 196.

(3) صحيح البخاري 1/ 6 و 6/ 215، وصحيح مسلم بشرح النووي 2/ 206.

(4) ينظر: العيني: عمدة القارى 1/ 62.

হেরা গুহার সেই বরকতময় সাক্ষাতের পর আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর জীবনের এই নতুন বিষয়ের বাস্তবতা নিয়ে বিশ্রাম ও গভীর চিন্তাভাবনার জন্য কিছু সময়ের প্রয়োজন বোধ করছিলেন। জিবরাঈল (আ.)-এর ওহি (وحي) অবতীর্ণ হওয়া কিছু সময়ের জন্য বন্ধ থাকার মাধ্যমে এটি সম্পন্ন হয়, যা তাঁকে পুনরায় সাক্ষাতের জন্য ব্যাকুল করে তোলে। ততক্ষণে তাঁর প্রাথমিক আতঙ্ক দূর হয়েছিল এবং তিনি ওরাকা বিন নাওফলের কথাগুলো নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন। ওরাকা হেরা গুহায় তাঁর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়ার পর বেশিদিন অতিবাহিত হওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেন। ইবনে সাদ আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা (روى) করেছেন যে, "যখন হেরা গুহায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর ওহি (وحي) অবতীর্ণ হলো, তখন তিনি কয়েকদিন জিবরাঈল (আ.)-কে দেখতে পাননি। এতে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হলেন, এমনকি তিনি কখনো সাবীর (১) পাহাড়ে আবার কখনো হেরা পাহাড়ে যেতেন এই উদ্দেশ্যে যে, সেখান থেকে নিজেকে নিচে ফেলে দেবেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন এভাবে কোনো এক পাহাড়ের চূড়ার দিকে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ আকাশ থেকে একটি শব্দ শুনতে পেলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) সেই শব্দ শুনে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন, অতঃপর তাঁর মাথা তুললেন। দেখলেন জিবরাঈল (আ.) বলছেন:

হে মুহাম্মদ, আপনি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর রাসূল, আর আমি জিবরাঈল। তিনি বলেন: এরপর আল্লাহর রাসূল (সা.) ফিরে এলেন এবং আল্লাহ তাঁর চক্ষু শীতল করলেন ও তাঁর চিত্তকে প্রশান্ত করলেন। অতঃপর ওহি (وحي) নিয়মিত ও তীব্রভাবে অবতীর্ণ হতে শুরু করল (২)।

বুখারি অন্য একটি বিস্তারিত বর্ণনা (رواية) জাবির বিন আবদুল্লাহ আনসারী (রা.) থেকে উদ্ধৃত করেছেন, "তিনি ওহির বিরতিকাল (فترة الوحي) সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তাঁর হাদিসে বলেন: (রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন) আমি হাঁটছিলাম, হঠাৎ আকাশ থেকে একটি শব্দ শুনতে পেলাম। আমি আমার দৃষ্টি উপরে তুললাম এবং দেখলাম সেই ফেরেশতা, যিনি হেরা গুহায় আমার কাছে এসেছিলেন, আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি কুরসিতে বসে আছেন। আমি তাঁকে দেখে আতঙ্কিত হলাম এবং ফিরে এসে বললাম: তোমরা আমাকে বস্ত্রাবৃত করো, আমাকে বস্ত্রাবৃত করো। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন— 'হে বস্ত্রাবৃত! উঠুন এবং সতর্ক করুন, আপনার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন, আপনার পোশাক পবিত্র রাখুন এবং অপবিত্রতা বর্জন করুন' [আল-মুদ্দাসসির: ১-৫]। এরপর ওহি (وحي) নিয়মিতভাবে অবতীর্ণ হতে থাকে" (৩)।

এভাবেই এই সময়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) হেরা গুহার সাক্ষাতে যে আতঙ্ক অনুভব করেছিলেন তা দূর হয়ে যায় এবং আতঙ্ক চলে যাওয়ার পর তিনি পুনরায় ফেরেশতাকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন (৪)।

--------------------------------------------

(১) সাবীর: মক্কার পাহাড়সমূহের মধ্যে একটি পাহাড়। (দ্রষ্টব্য: সফিউদ্দিন বাগদাদি: মারাসিদুল ইত্তিলা ১/২৯২)।

(2) তবকাতুল কুবরা ১/১৯৬।

(3) সহিহ বুখারি ১/৬ ও ৬/২১৫ এবং শরহে নববীসহ সহিহ মুসলিম ২/২০৬।

(4) দ্রষ্টব্য: আইনি: উমদাতুল কারি ১/৬২।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ২১)
قال الحافظ ابن حجر: «وفتور الوحي عبارة عن تأخره مدة من الزمان، وكان ذلك ليذهب ما كان رسول الله صلى الله عليه وسلم وجده من الرّوع، وليحصل له التشوّف إلى العود … » (1).

وقد أيقن رسول الله صلى الله عليه وسلم بعد هذا كله أن الله تعالى قد اختاره رسولا، وصار يتلقى القرآن عن طريق جبريل فحمل أعباء الرسالة وأخذ يدعو إليها واستمر جهاده ثلاثا وعشرين سنة اكتمل خلالها نزول القرآن، وترسخت الدعوة والعقيدة في أرجاء الجزيرة العربية، قبل وفاته صلى الله عليه وسلم (2).

--------------------------------------------

(1) فتح الباري 1/ 27.

(2) ذهب عدد من المؤلفين في علوم القرآن في عصرنا إلى أن مدة فتور الوحي كانت ثلاث سنين، معتمدين في ذلك على رواية عن عامر الشعبي أحد علماء التابعين (ت 103 هـ) (ينظر: محمد رشيد رضا: الوحي المحمدي ص 125، ومحمد عبد الله دراز: مدخل إلى القرآن الكريم ص 30، وصبحي الصالح: مباحث في علوم القرآن ص 36، ومالك بن نبي: الظاهرة القرآنية ص 185).

والذي يبدو راجحا هو أن فتور الوحي لم يمتد ثلاث سنوات للأسباب الآتية:

1 - إن الرواية المنقولة عن عامر الشعبي لا تتحدث عن فتور الوحي أولا، وهي رواية غير موثوقة عند أهل العلم ثانيا، وجاء فيها «بعث لأربعين، ووكّل به إسرافيل ثلاث سنين، ثم وكّل به جبريل» (ينظر: ابن حجر: فتح الباري 1/ 27). وقال ابن سعد في شأن هذه الرواية: «فذكرت هذا الحديث لمحمد بن عمر (يعني الواقدي شيخه) فقال: ليس يعرف أهل العلم ببلدنا أن إسرافيل قرن بالنبي صلى الله عليه وسلم وأنّ علماءهم وأهل السيرة منهم يقولون: لم يقرن به غير جبريل من حين أنزل عليه الوحي إلى أن قبض صلى الله عليه وسلم» (الطبقات الكبرى 1/ 191).

2 - إن ما ورد في روايات فتور الوحي لا يحدد المدة التي كانت بين نزول أول سورة العلق ونزول أول سورة المدثر، ويبدو أنها لم تطل كثيرا، ففي رواية البخاري «وفتر الوحي فترة، حتى حزن رسول الله صلى الله عليه وسلم» (صحيح البخاري 6/ 215)، وفي طبقات ابن سعد «لما نزل الوحي بحراء مكث أياما لا يرى جبريل، فحزن حزنا شديدا» (الطبقات الكبرى 1/ 196)، وفي السيرة النبوية لابن هشام «قال ابن إسحاق: ثم فتر الوحي عن رسول الله صلى الله عليه وسلم فترة من ذلك، حتى شق ذلك عليه فأحزنه» (السيرة النبوية 1/ 241).
হাফেজ ইবনে হাজার বলেন: «ওহি স্থগিত থাকা (فتور الوحي) বলতে সময়ের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তা বিলম্বিত হওয়াকে বোঝায়। আর এটি ঘটেছিল রাসূলুল্লাহ (সা.) যে আতঙ্ক অনুভব করেছিলেন তা দূর করার জন্য এবং পুনরায় ওহি লাভের প্রতি তাঁর ব্যাকুলতা সৃষ্টির জন্য … » (১)।

এই সবকিছুর পর রাসূলুল্লাহ (সা.) নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করেছিলেন যে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে রাসূল হিসেবে মনোনীত করেছেন। এরপর তিনি জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে কুরআন লাভ করতে থাকেন এবং রিসালাতের গুরুদায়িত্ব বহন করেন ও ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। দীর্ঘ তেইশ বছর তাঁর জিহাদ অব্যাহত থাকে, যে সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ কুরআন অবতীর্ণ হয় এবং তাঁর (সা.) ইন্তেকালের পূর্বে সমগ্র আরব উপদ্বীপে দাওয়াত ও আকিদা সুপ্রতিষ্ঠিত হয় (২)।

--------------------------------------------

(১) ফাতহুল বারী ১/ ২৭।

(২) বর্তমান যুগের উলুমুল কুরআনের বেশ কয়েকজন লেখক মনে করেন যে, ওহি স্থগিত থাকার (فتور الوحي) সময়কাল ছিল তিন বছর। এই বিষয়ে তাঁরা তাবেয়ি (تابعي) পণ্ডিতদের অন্যতম আমির আশ-শাবি (ওফাত ১০৩ হিজরি)-এর একটি বর্ণনার ওপর নির্ভর করেছেন (দেখুন: মুহাম্মদ রশীদ রিদা: আল-ওয়াহয়ুল মুহাম্মদী পৃ. ১২৫, মুহাম্মদ আবদুল্লাহ দরাজ: মাদখাল ইলাল কুরআনিল কারীম পৃ. ৩০, সুবহি আস-সালেহ: মাবাহিছ ফি উলুমিল কুরআন পৃ. ৩৬, এবং মালিক বিন নবী: আজ-জাহিরাতুল কুরআনিয়্যাহ পৃ. ১৮৫)।

তবে যে বিষয়টি অগ্রগণ্য (راجح) বলে মনে হয় তা হলো, ওহি স্থগিত থাকার (فتور الوحي) সময়কাল তিন বছর দীর্ঘ ছিল না। এর কারণগুলো হলো:

১ - আমির আশ-শাবি থেকে বর্ণিত রেওয়ায়াতটি প্রথমত ওহি স্থগিত থাকা সম্পর্কে নয়, আর দ্বিতীয়ত এটি আহলে ইলমদের কাছে নির্ভরযোগ্য (موثوقة) নয়। তাতে বলা হয়েছে: «চল্লিশ বছর বয়সে তাঁকে নবুয়ত দেওয়া হয় এবং তিন বছর পর্যন্ত ইসরাফিল (আ.)-কে তাঁর সাথে নিযুক্ত রাখা হয়, এরপর জিবরাইল (আ.)-কে নিযুক্ত করা হয়» (দেখুন: ইবনে হাজার: ফাতহুল বারী ১/ ২৭)। এই রেওয়ায়াত সম্পর্কে ইবনে সাদ বলেন: «আমি মুহাম্মদ ইবনে উমরকে (অর্থাৎ তাঁর শিক্ষক ওয়াকিদি) এই হাদিসটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন: আমাদের শহরের আলেমগণ এমনটি জানেন না যে ইসরাফিল (আ.) নবী (সা.)-এর সাথে যুক্ত ছিলেন। সেখানকার আলেম ও সিরাত বিশেষজ্ঞরা বলেন: ওহি অবতীর্ণ হওয়ার শুরু থেকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল পর্যন্ত জিবরাইল (আ.) ছাড়া অন্য কেউ তাঁর সাথে যুক্ত ছিলেন না» (আত-তাবাকাতুল কুবরা ১/ ১৯১)।

২ - ওহি স্থগিত হওয়া সংক্রান্ত রেওয়ায়াতসমূহে সূরা আলাকের প্রথম অংশ এবং সূরা মুদ্দাসসিরে প্রথম অংশ অবতীর্ণ হওয়ার মধ্যবর্তী সময়কাল সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। তবে মনে হয় এই সময়কাল খুব বেশি দীর্ঘ ছিল না। সহীহ বুখারীর বর্ণনায় এসেছে: «ওহি কিছু সময়ের জন্য স্থগিত থাকে, যার ফলে রাসূলুল্লাহ (সা.) ব্যথিত হন» (সহীহ বুখারী ৬/ ২১৫)। ইবনে সাদের আত-তাবাকাতুল কুবরায় আছে: «যখন হেরা গুহায় ওহি নাযিল হলো, এরপর বেশ কয়েকদিন জিবরাইল (আ.)-কে দেখা গেল না, এতে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হলেন» (আত-তাবাকাতুল কুবরা ১/ ১৯৬)। ইবনে হিশামের সিরাতুন নববীতে বর্ণিত হয়েছে: «ইবনে ইসহাক বলেন: এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট কিছুকাল ওহি স্থগিত থাকে, যা তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ও বেদনাদায়ক ছিল» (সিরাতুন নববী ১/ ২৪১)।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ২২)
‌‌المبحث الرابع كيف تلقى رسول الله صلى الله عليه وسلم القرآن

ليس من شأن البشر التلقي عن الله تعالى مباشرة، وقد أكد القرآن ذلك، وبيّن السّبل التي يبلّغ الله بها كلماته إلى المصطفين من عباده، قال الله تعالى:

* وَما كانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِّمَهُ اللَّهُ إِلَّا وَحْياً أَوْ مِنْ وَراءِ حِجابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ ما يَشاءُ إِنَّهُ عَلِيٌّ حَكِيمٌ (51) وَكَذلِكَ أَوْحَيْنا إِلَيْكَ رُوحاً مِنْ أَمْرِنا ما كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتابُ وَلَا الْإِيمانُ وَلكِنْ جَعَلْناهُ نُوراً نَهْدِي بِهِ مَنْ نَشاءُ مِنْ عِبادِنا وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلى صِراطٍ مُسْتَقِيمٍ (52) صِراطِ اللَّهِ الَّذِي لَهُ ما فِي السَّماواتِ وَما فِي الْأَرْضِ أَلا إِلَى اللَّهِ تَصِيرُ الْأُمُورُ (53) [الشورى].

فهذه الآيات تبيّن أنّ هناك ثلاث طرق لتبليغ المعرفة الإلهية هي:

1 - الوحي: ومعناه في اللغة الإعلام الخفي (1)، وقد يكون بالرؤيا الصادقة أو بالإلهام، وهو أن يلقي الله في النفس أمرا يبعث على الفعل أو الترك (2).

2 - من وراء حجاب، كما كلّم الله تعالى موسى، عليه السلام (سورة النساء 164 وسورة طه 11).

3 - الرسول، وهو الملك الذي ينزل إلى الانبياء والرسل (3).

--------------------------------------------

3 - إن انقطاع الوحي ثلاث سنوات لا يتناسب مع ما وجد فيه رسول الله صلى الله عليه وسلم نفسه من التطلع إلى لقاء جبريل وما أصابه من الحزن بسبب تأخر ذلك بعض الوقت، فلو كانت مدة انقطاع الوحي ثلاث سنوات لأدى ذلك فيما أحسب إلى أحد أمرين: إما نسيان القضية كلها، وإما أن يؤدي ذلك الحزن بحياته صلى الله عليه وسلم ومن ثم فإن الراجح أن مدة فتور الوحي كانت أياما أو أسابيع معدودة (ينظر: ابن حجر: فتح الباري 1/ 27 و 8/ 710 و 12/ 360).

(1) ابن منظور: لسان العرب 20/ 257 وحي.

(2) المصدر نفسه 16/ 28 لهم.

(3) ينظر: الطبري: جامع البيان 25/ 45.
চতুর্থ পরিচ্ছেদ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে কুরআন গ্রহণ করেছেন

সরাসরি মহান আল্লাহর নিকট থেকে ওহি গ্রহণ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কুরআন এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে এবং সেই পথগুলো ব্যাখ্যা করেছে যার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর নির্বাচিত বান্দাদের কাছে তাঁর বাণী পৌঁছে দেন। মহান আল্লাহ বলেন:

* "আর কোনো মানুষের জন্য এমন অবকাশ নেই যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন ওহি (وحي) ব্যতীত, অথবা পর্দার আড়াল ব্যতীত, কিংবা তিনি কোনো দূত প্রেরণ করবেন, অতঃপর তিনি তাঁর অনুমতিক্রমে যা চান ওহি (وحي) করবেন; নিশ্চয়ই তিনি সমুন্নত, প্রজ্ঞাময় (৫১)। আর এভাবেই আমি তোমার প্রতি আমার নির্দেশ থেকে রুহকে ওহি (وحي) করেছি; তুমি জানতে না কিতাব কী এবং ইমান কী, কিন্তু আমি একে আলো বানিয়েছি যা দিয়ে আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথপ্রদর্শন করি; আর তুমি তো অবশ্যই সরল পথের দিশা দিচ্ছ (৫২)। আল্লাহর পথ, যাঁর জন্য আসমানসমূহে যা আছে এবং জমিনে যা আছে সব কিছু; জেনে রেখো, সকল বিষয় আল্লাহর দিকেই ফিরে যায় (৫৩)।" [আশ-শূরা]।

এই আয়াতগুলো স্পষ্ট করে যে, ঐশী জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার তিনটি মাধ্যম রয়েছে, সেগুলো হলো:

১ - ওহি (وحي): আভিধানিক অর্থে এর অর্থ হলো গোপন সংবাদ প্রদান (১); এটি সত্য স্বপ্ন অথবা ইলহামের মাধ্যমে হতে পারে। আর তা হলো আল্লাহ মানুষের অন্তরে এমন একটি বিষয় ঢেলে দেবেন যা তাকে কোনো কাজ করতে বা বর্জন করতে উদ্বুদ্ধ করে (২)।

২ - পর্দার আড়াল থেকে: যেমন মহান আল্লাহ মূসা আলাইহিস সালামের সাথে কথা বলেছিলেন (সূরা আন-নিসা ১৬৪ এবং সূরা ত্বা-হা ১১)।

৩ - দূত: তিনি হলেন সেই ফেরেশতা যিনি নবী ও রাসূলগণের নিকট অবতীর্ণ হন (৩)।

--------------------------------------------

৩ - ওহি (وحي) তিন বছর বন্ধ থাকা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জিবরাঈল আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাতের প্রতি যে ব্যাকুলতা এবং ওহি বিলম্বিত হওয়ার কারণে তাঁর মনে যে দুঃখের সৃষ্টি হয়েছিল তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যদি ওহি (وحي) বন্ধ থাকার সময়কাল তিন বছর হতো, তবে আমার ধারণা মতে তা দুটি বিষয়ের যেকোনো একটির দিকে নিয়ে যেত: হয় পুরো বিষয়টি বিস্মৃত হওয়া, নতুবা সেই দুঃখ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের ওপর প্রভাব ফেলা। ফলশ্রুতিতে প্রাধান্যপ্রাপ্ত (الراجح) মত হলো যে, ওহি স্থগিত থাকার (فتور الوحي) সময়কাল ছিল মাত্র কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ। (দ্রষ্টব্য: ইবনে হাজার: ফাতহুল বারী ১/২৭ ও ৮/৭১০ এবং ১২/৩৬০)।

(১) ইবনে মানযুর: লিসানুল আরব ২০/ ২৫৭ ওহি (وحي)।

(২) একই উৎস ১৬/ ২৮ লাহম।

(৩) দ্রষ্টব্য: তবারী: জামিউল বয়ান ২৫/ ৪৫।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ২৩)
وقد أشارت الآية السابقة إلى أن ما أوحاه الله إلى النبي محمد صلى الله عليه وسلم هو من جنس ما أوحاه إلى الأنبياء السابقين وَكَذلِكَ أَوْحَيْنا إِلَيْكَ رُوحاً (52) [الشورى]،

وقد أكدت هذا المعنى آيات أخرى، منها قوله تعالى:* إِنَّا أَوْحَيْنا إِلَيْكَ كَما أَوْحَيْنا إِلى نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِنْ بَعْدِهِ … (163) [النساء].

وقد سمّي نزول جبريل عليه السلام بالقرآن على رسول الله صلى الله عليه وسلم وحيا لأنه أسرّه على الخلق، وخصّ به النبيّ المبعوث إليه (1). فلم يكن الصحابة يرون الملك وقت نزوله بالقرآن، مع أنهم شاهدوا آثار نزوله.

ولا شك في أن الوحي من الغيب الذي لا يعرف بالحواس ولا يدرك بالعقل المجرد، ومن ثم فإن القول في حقيقته وكيفيته يتوقف على ما ورد عنه في القرآن الكريم والسنة النبوية المشرفة، وقد جاء في عدد من الأحاديث والآثار وصف لحالة النبي صلى الله عليه وسلم وقت نزول جبريل 5 بالقرآن، منها ما يتعلق بالجانب الخفي من الوحي، ومنها ما يتعلق بآثاره الظاهرة التي لاحظها الصحابة، رضي الله عنهم.

أما الجانب الخفي من الوحي فقد سأل الصحابة عنه رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال عبد الله بن عمرو: «سألت النبي صلى الله عليه وسلم فقلت: يا رسول الله: هل تحسّ بالوحي؟

قال: نعم، أسمع صلصلة، ثم أسكت عند ذلك» (2).

وروى البخاري «عن عائشة أم المؤمنين، رضي الله عنها، أن الحارث بن هشام، رضي الله عنه، سأل رسول الله صلى الله عليه وسلم، فقال: يا رسول الله، كيف يأتيك الوحي؟ فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: أحيانا يأتيني مثل صلصلة الجرس، وهو أشدّه عليّ، فيفصم عني وقد وعيت ما قال، وأحيانا يتمثّل لي الملك رجلا فيكلمني فأعي ما يقول» (3).

--------------------------------------------

(1) ابن منظور: لسان العرب 20/ 258 وحي.

(2) قال الهيثمي (مجمع الزوائد 8/ 256): رواه أحمد والطبراني، وإسناده حسن.

(3) صحيح البخاري 1/ 4، والترمذي: كتاب السنن 5/ 558.
পূর্ববর্তী আয়াতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি যা ওহী (وحي) করেছেন, তা পূর্ববর্তী নবীদের প্রতি প্রেরিত ওহীরই সমজাতীয়; "এভাবেই আমি আপনার প্রতি রুহ তথা ওহী (وحي) পাঠিয়েছি" (সূরা আশ-শূরা: ৫২),

অন্যান্য আয়াতও এই বিষয়টিকে সুনিশ্চিত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে আল্লাহর বাণী: "নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি ওহী (وحي) পাঠিয়েছি যেমনিভাবে আমি নূহ ও তাঁর পরবর্তী নবীদের প্রতি ওহী (وحي) পাঠিয়েছি..." (সূরা আন-নিসা: ১৬৩)।

জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট কুরআন নিয়ে আসাকে ওহী (وحي) হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে, কারণ তিনি একে সৃষ্টিজগত থেকে গোপনে রাখতেন এবং প্রেরিত নবীর জন্য একে নির্দিষ্ট করতেন (১)। কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় সাহাবীগণ ফেরেশতাকে দেখতেন না, যদিও তাঁরা ওহী অবতীর্ণ হওয়ার প্রভাব বা আলামত প্রত্যক্ষ করতেন।

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ওহী (وحي) অদৃশ্যের (غيب) বিষয় যা ইন্দ্রিয় দ্বারা জানা যায় না এবং কেবল বিমূর্ত জ্ঞান দিয়ে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। ফলে এর হাকিকত ও ধরণ সম্পর্কে কথা বলা কুরআনুল কারিম ও সম্মানিত সুন্নাহতে এ সংক্রান্ত যা বর্ণিত হয়েছে তার ওপর নির্ভরশীল। জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) যখন কুরআন নিয়ে আসতেন, তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অবস্থার বর্ণনা বেশ কিছু হাদিস ও আসারে (آثار) এসেছে; যার কিছু ওহীর অপ্রকাশ্য দিকের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং কিছু তার বাহ্যিক আলামতের সাথে সংশ্লিষ্ট যা সাহাবীগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) লক্ষ্য করেছিলেন।

ওহীর অপ্রকাশ্য দিক সম্পর্কে সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: «আমি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলাম—হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি ওহী (وحي) অনুভব করতে পারেন?

তিনি বললেন: হ্যাঁ, আমি ঝনঝনানি শব্দ শুনতে পাই, তখন আমি চুপ হয়ে যাই» (২)।

ইমাম বুখারি বর্ণনা করেছেন «উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত যে, হারিস ইবনে হিশাম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলেন: হে আল্লাহর রাসূল, আপনার নিকট ওহী (وحي) কীভাবে আসে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: কখনও তা আমার নিকট ঘণ্টার শব্দের মতো আসে এবং এটিই আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন হয়। এরপর তা আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হলে তিনি যা বলেছেন তা আমি সংরক্ষণ করে ফেলি। আবার কখনও ফেরেশতা আমার নিকট মানুষের আকৃতিতে প্রকাশ পান এবং আমার সাথে কথা বলেন, তখন তিনি যা বলেন আমি তা স্মরণ রাখি» (৩)।

--------------------------------------------

(১) ইবনে মানযুর: লিসানুল আরব ২০/ ২৫৮, ওহী (وحي)।

(২) হাইসামি (মাজমাউয যাওয়াইদ ৮/ ২৫৬) বলেছেন: এটি আহমাদ ও তাবারানি বর্ণনা করেছেন এবং এর সনদ হাসান (حسن)।

(৩) সহীহ বুখারি ১/ ৪ এবং তিরমিযী: কিতাবুস সুনান ৫/ ৫৫৮।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ২৪)
ويؤكد هذا الحديث أن للوحي صورتين، لكن يجب ملاحظة تأكيد النبي صلى الله عليه وسلم على وعيه لما يلقيه إليه الملك في كلتا الصورتين، فهو يتلقاه بقلبه وينطبع في عقله، وقد قال الله تعالى: وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعالَمِينَ (192) نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ (193) عَلى قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ (194) بِلِسانٍ عَرَبِيٍّ مُبِينٍ (195) [الشعراء].

وأما الجانب الظاهر المتعلق بآثار الوحي المحسوسة فقد تحدث عنها الصحابة، رضوان الله عليهم، ونقلوها إلى أجيال الأمة، وأول ما لاحظوا أن النبي صلى الله عليه وسلم كان يعاني من التنزيل شدّة، فقد نقل مسلم بن الحجاج في صحيحه عن عبادة بن الصامت أنه قال: «كان نبي الله صلى الله عليه وسلم إذ أنزل عليه كرب لذلك» (1). وأنه إذا أنزل عليه الوحي أخذته البرحاء- كما روى البخاري (2) - والبرحاء شدّة الحمّى، وهي هنا شدّة الكرب من ثقل الوحي (3). وقد لاحظ الصحابة تصبب العرق من جبينه، قالت السيدة عائشة، رضي الله عنها: «ولقد رأيته ينزل عليه الوحي في اليوم الشديد البرد فيفصم عنه، وإن جبينه ليتفصّد عرقا» (4).

وكانت تلك الشّدّة المصاحبة للوحي التي تغشى رسول الله صلى الله عليه وسلم يمتد تأثيرها إلى ما يتصل به أو يلامسه، فها هم الصحابة يشهدون رسول الله صلى الله عليه وسلم يوحى إليه وهو على ناقته، فتغشى الناقة تلك الشدة، كما روى ابن سعد عن أبي أروى الدّوسي، قال: «رأيت الوحي ينزل على النبي صلى الله عليه وسلم وإنه على راحلته، فترغو وتفتل يديها، حتى أظن أن ذراعها ينقصم، فربما بركت، وربما قامت موتّدة يديها، حتى يسرّى عنه من ثقل الوحي، وأنه ليتحدّر منه مثل الجمان» (5).

--------------------------------------------

(1) صحيح مسلم بشرح النووي 11/ 190، والبيهقي: دلائل النبوة 7/ 54.

(2) ينظر: ابن حجر: فتح الباري 5/ 272.

(3) ابن الأثير: النهاية 1/ 113، وابن منظور: لسان العرب 3/ 233 (برح).

(4) صحيح البخاري 1/ 4.

(5) الطبقات الكبرى 1/ 197، وينظر: البيهقي: دلائل النبوة 7/ 53. وقال الصحابي عبد الله.
এই হাদিসটি নিশ্চিত করে যে, ওহীর দুটি রূপ রয়েছে। তবে ওহীর উভয় রূপেই ফেরেশতা তাঁর নিকট যা পেশ করতেন, সে সম্পর্কে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পূর্ণ সচেতনতার বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে লক্ষ করতে হবে। তিনি তা অন্তরে গ্রহণ করতেন এবং তাঁর স্মৃতিপটে তা অঙ্কিত হয়ে যেত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: “নিশ্চয়ই এটি বিশ্বজাহানের রবের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। আপনার অন্তরে তা নিয়ে অবতরণ করেছেন বিশ্বস্ত রূহ (জিবরাঈল), যাতে আপনি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন, সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়।” [আশ-শুআরা: ১৯২-১৯৫]।

আর ওহীর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রভাব সংশ্লিষ্ট বাহ্যিক দিকটি নিয়ে সাহাবীগণ (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) আলোচনা করেছেন এবং উম্মতের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁরা প্রথম যা লক্ষ করেছিলেন তা হলো, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ওহী নাযিলের সময় প্রচণ্ড কষ্ট অনুভব করতেন। মুসলিম বিন হাজ্জাজ তাঁর সহীহ গ্রন্থে উবাদাহ ইবনুস সামিত থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: «যখন আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর ওহী নাযিল হতো, তখন তিনি তজ্জনিত কারণে ব্যথিত ও বিমর্ষ হয়ে পড়তেন» (১)। আর যখন তাঁর ওপর ওহী নাযিল হতো, তখন তিনি ‘বুরহা’ (তীব্র কষ্ট) দ্বারা আক্রান্ত হতেন—যেমনটি বুখারী বর্ণনা করেছেন (২)—আর ‘বুরহা’ হলো প্রচণ্ড জ্বরের তীব্রতা, যা এখানে ওহীর ভারের কারণে সৃষ্ট তীব্র কষ্টকে বোঝানো হয়েছে (৩)। সাহাবীগণ তাঁর কপাল থেকে ঘাম ঝরতেও দেখেছেন। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন: «আমি প্রচণ্ড শীতের দিনেও তাঁর ওপর ওহী নাযিল হতে দেখেছি; যখন ওহীর সমাপ্তি ঘটত, তখন দেখা যেত তাঁর কপাল থেকে ঘাম ঝরছে» (৪)।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে আচ্ছন্নকারী ওহীর সেই তীব্র প্রভাব তাঁর সংস্পর্শে থাকা বা তাঁকে স্পর্শ করা বস্তুর ওপরও বিস্তৃত হতো। এই তো সাহাবীগণ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর ওহী নাযিল হওয়ার সময় তিনি তাঁর উটনীর ওপর আরোহিত ছিলেন, ফলে উটনীটিও সেই তীব্রতা দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। যেমনটি ইবনে সাদ আবু আরওয়া আদ-দাওসি থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: «আমি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে তাঁর বাহনের ওপর থাকাবস্থায় ওহী নাযিল হতে দেখেছি। তখন উটনীটি শব্দ করত এবং তার পাগুলো সংকুচিত করত, এমনকি আমার মনে হতো তার নলী ভেঙে যাবে। কখনো সেটি বসে পড়ত, আবার কখনো পা শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকত, যতক্ষণ না ওহীর সেই ভার অপসারিত হতো। আর তাঁর দেহ থেকে মুক্তার দানার মতো ঘাম ঝরত» (৫)।

--------------------------------------------

(১) সহীহ মুসলিম শারহুন নববী ১১/১৯০, এবং বায়হাকী: দালায়েলুন নবুওয়াত ৭/৫৪।

(২) দ্রষ্টব্য: ইবনে হাজার: ফাতহুল বারী ৫/২৭২।

(৩) ইবনুল আসীর: আন-নিহায়াহ ১/১১৩, এবং ইবনে মানযুর: লিসানুল আরব ৩/২৩৩ (ব্রহ)।

(৪) সহীহ বুখারী ১/৪।

(৫) আত-তাবাকাতুল কুবরা ১/১৯৭, এবং দ্রষ্টব্য: বায়হাকী: দালায়েলুন নবুওয়াত ৭/৫৩। সাহাবী আবদুল্লাহ বলেন।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ২৫)
وها هو زيد بن ثابت كاتب الوحي يقول: «إني لقاعد إلى جنب النبي صلى الله عليه وسلم إذ أوحي إليه، وغشيته السكينة، فوضع فخذه على فخذي، قال زيد، فلا والله ما وجدت شيئا قطّ أثقل منها» وفي رواية: «فثقلت عليّ حتى خفت أن ترضّ فخذي» (1).

وكان مما لاحظه الصحابة عند نزول الوحي ما رواه عدد من المحدّثين عن عمر بن الخطاب أنه قال: «كان رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا نزل عليه الوحي يسمع عند وجهه دويّ كدويّ النحل» (2).

إن المتأمل لحالة نزول الوحي في جانبيها الغيبي الذي وضّحه النبي صلى الله عليه وسلم والمحسوس الذي وصفه الصحابة، رضي الله عنهم، يدرك أنها أبعد ما تكون عن حالة السبات الطبيعي الذي يعتري المرء في وقت حاجته إلى النوم، فإنها كانت تعرو النبي صلى الله عليه وسلم قائما أو قاعدا أو سائرا أو راكبا، بكرة أو عشيا، وكانت تعروه فجأة وتنقضي في لحظات يسيرة، لا بالتدريج الذي يعرض للوسنان الذي يغفو ويغرق في النوم، كما أنها حالة تباين كليا تلك الأعراض المرضية والنوبات

العصبية التي تصفرّ فيها الوجوه، وتبرد الأطراف، وتصطكّ الأسنان، وتتكشف العورات، ويحتجب نور العقل، لأنها حالة تتسم بالجلال والوقار، وهي مبعث نور لا ظلمة، ومصدر علم لا جهالة (3).

--------------------------------------------

ابن عمرو: «أنزلت على رسول الله صلى الله عليه وسلم سورة المائدة، وهو راكب على راحلته، فلم تستطع أن تحمله، فنزل عنها» قال الهيثمي في مجمع الزوائد (7/ 13): «رواه أحمد، وفيه ابن لهيعة، والأكثر على ضعفه، وقد يحسّن حديثه وبقية رجاله ثقات» وينظر:

الساعاتي: الفتح الرباني 18/ 125.

(1) ابن حجر: فتح الباري 8/ 259 - 260.

(2) عبد الرزاق: المصنف 3/ 383، والترمذي: كتاب السنن 5/ 305، والبيهقي: دلائل النبوة 7/ 55.

(3) ينظر: محمد عبد الله دراز: النبأ العظيم ص 70 وما بعدها.
ওহী লেখক যায়িদ ইবনে সাবিত (রা.) বলেন: «আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে বসা ছিলাম যখন তাঁর ওপর ওহী অবতীর্ণ হচ্ছিল, এবং তাঁর ওপর প্রশান্তি ছেয়ে গেল। তিনি তাঁর উরু আমার উরুর ওপর রাখলেন। যায়িদ (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম, আমি এর চেয়ে ভারী আর কিছু কখনো অনুভব করিনি» অন্য বর্ণনায় রয়েছে: «তা আমার ওপর এতই ভারী হয়ে উঠল যে, আমি আশঙ্কা করলাম আমার উরু পিষ্ট হয়ে যাবে» (১)।

ওহী নাযিলের সময় সাহাবীগণ যা লক্ষ্য করেছিলেন সে সম্পর্কে একদল হাদিস বিশারদ উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি বলেন: «রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর যখন ওহী নাযিল হতো, তখন তাঁর চেহারার কাছে মৌমাছির গুঞ্জনের মতো শব্দ শোনা যেত» (২)।

ওহী অবতরণের অবস্থার অদৃশ্য বা গায়বি দিকটি—যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট করেছেন—এবং এর দৃশ্যমান বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দিকটি—যা সাহাবীগণ (রা.) বর্ণনা করেছেন—তা নিয়ে যে ব্যক্তি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে, সে বুঝতে পারবে যে, ঘুমের প্রয়োজনে মানুষের ওপর যে স্বাভাবিক তন্দ্রাচ্ছন্নতা ভর করে, এটি তা থেকে অনেক দূরে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দণ্ডায়মান, উপবিষ্ট, চলন্ত কিংবা আরোহী অবস্থায় থাকতেন, সকাল বা সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই তাঁর ওপর ওহী আপতিত হতো এবং তা অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যেত; তন্দ্রাচ্ছন্ন ব্যক্তির মতো ধীরে ধীরে ঘুমের গভীরে তলিয়ে যাওয়ার মতো তা ছিল না। তদ্রূপ, এটি সেই সমস্ত রোগব্যাধি বা স্নায়বিক অসুস্থতার লক্ষণ থেকেও সম্পূর্ণ ভিন্ন যাতে চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যায়, হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়, দাঁতে দাঁত লেগে যায়, সতর উন্মুক্ত হয়ে পড়ে এবং জ্ঞান লোপ পায়। কারণ এটি ছিল গাম্ভীর্য ও মর্যাদাপূর্ণ এক অবস্থা, যা অন্ধকারের পরিবর্তে আলোর উৎস এবং অজ্ঞতার পরিবর্তে জ্ঞানের আধার (৩)।

--------------------------------------------

ইবনে আমর বলেন: «রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর যখন সূরা আল-মায়িদাহ নাযিল হয় তখন তিনি তাঁর উটনীর ওপর আরোহী ছিলেন। উটনীটি তাঁর ভার বহন করতে পারছিল না, তাই তিনি এর ওপর থেকে নেমে পড়লেন» আল-হাইসামি মাজমাউয যাওয়ায়েদ গ্রন্থে (৭/১৩) বলেছেন: «এটি আহমাদ বর্ণনা করেছেন, আর এর সনদে ইবনে লাহিয়া রয়েছেন। অধিকাংশের মতে তিনি দুর্বল (ضعيف), তবে কখনো কখনো তাঁর হাদিসকে হাসান গণ্য (حسن) করা হয় এবং এর অবশিষ্টাংশ বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য (ثقات)» এবং আরও দেখুন:

আস-সাআতি: আল-ফাতহুর রব্বানি ১৮/ ১২৫।

(1) ইবনে হাজার: ফাতহুল বারী ৮/ ২৫৯ - ২৬০।

(2) আব্দুর রাজ্জাক: আল-মুসান্নাফ ৩/ ৩৮৩, তিরমিজি: কিতাবুস সুনান ৫/ ৩০৫, বায়হাকী: দালায়েলুন নুবুওয়াহ ৭/ ৫৫।

(3) দেখুন: মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ দরাজ: আন-নাবাউল আজিম পৃষ্ঠা ৭০ এবং পরবর্তী অংশ।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ২৬)
إن حالة الوحي تكررت مرات كثيرة، في حياة رسول الله صلى الله عليه وسلم بعد بعثته، وكانت تلك الحالة معروفة للصحابة، وكانت تتسم لحظاتها بالسكينة والوقار، وكان الصحابة يطرقون خلالها بانتظار سماع الوحي الجديد، روى الإمام مسلم في صحيحه عن أبي هريرة، رضي الله عنه، أنه قال: «وكان إذا جاء الوحي لا يخفى علينا، فإذا جاء فليس أحد يرفع طرفه إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم حتى ينقضي الوحي» (1).

إن التلقي عن الله تعالى، حتى وإن كان عن طريق الملك، أمر خارج عن معهود الناس، إنه أمر عجيب، لكنه حدث مرات كثيرة على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم وأحس بحدوثه كثيرون، ورأوا مظاهره رأي العين، وتلقّوا ثمرته، وهي هذا القرآن العظيم الذي تلاه رسول الله صلى الله عليه وسلم على الناس، وحفظه عنه صحابته، وكتبوه، وعلّموه من جاء بعدهم، وتناقلته الأمة خلال العصور.

 

‌‌المبحث الخامس حفظ النبي صلى الله عليه وسلم للقرآن

أدرك رسول الله صلى الله عليه وسلم حقيقة دوره الجديد بعد ما نزل عليه قوله تعالى: اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ (1) [العلق]، ونداء جبريل له: يا محمد أنت رسول الله حقا، ثم نزول قوله تعالى: يا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ (1) قُمْ فَأَنْذِرْ (2) [المدثر]. وأن عليه أن يحمل الرسالة الإلهية ويدعو إليها الناس من حوله، وكانت طريقة تلقيه القرآن من جبريل عليه السلام لا تعطيه الفرصة للمراجعة والحفظ في لحظة التلقي، فكانت هذه الحالة تثير قلقه وخوفه من فقدان شيء من ألفاظ القرآن في وقت تلقيه من الملك.

وكان رسول الله صلى الله عليه وسلم يتعجّل في بادئ الأمر في حفظ القرآن، فيسابق جبريل، وهو يلقي إليه القرآن ساعة الوحي، فيردد الآيات قبل أن ينتهي الملك، مخافة أن ينسى منها شيئا، وكان ذلك مما يشق عليه، فجاء القرآن يطمئنه في أول

--------------------------------------------

(1) صحيح مسلم بشرح النووي 12/ 128، والبيهقي: دلائل النبوة 7/ 54.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়ত প্রাপ্তির পর তাঁর জীবনে ওহির (وحي) অবস্থা বহুবার পুনরাবৃত্ত হয়েছে। সেই অবস্থা সাহাবায়ে কেরামের কাছে সুপরিচিত ছিল এবং সেই মুহূর্তগুলো প্রশান্তি ও গাম্ভীর্য দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত থাকত। সাহাবায়ে কেরাম সেই সময় নতুন ওহি (وحي) শোনার অপেক্ষায় মস্তক অবনত করে থাকতেন। ইমাম মুসলিম তাঁর সহিহ গ্রন্থে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: «যখন ওহি (وحي) নাযিল হতো, তখন তা আমাদের কাছে অস্পষ্ট থাকত না। যখন তা আসত, তখন ওহি (وحي) শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে চোখ তুলে তাকাতেন না» (১)।

মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি গ্রহণ করা, এমনকি তা যদি ফেরেশতার মাধ্যমেও হয়, তা মানুষের সাধারণ অভ্যাসের বাইরের একটি বিষয়। এটি একটি বিস্ময়কর ব্যাপার, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এটি বহুবার ঘটেছে এবং অনেকে এর সংঘটন অনুভব করেছেন। তাঁরা চাক্ষুষভাবে এর লক্ষণগুলো দেখেছেন এবং এর ফল লাভ করেছেন, আর তা হলো এই মহান কুরআন যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের কাছে তিলাওয়াত করেছেন, তাঁর সাহাবায়ে কেরাম তা হিফজ করেছেন, লিখে রেখেছেন, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষা দিয়েছেন এবং যুগ যুগ ধরে উম্মত তা পর্যায়ক্রমে বর্ণনা করে আসছে।

 

‌‌পঞ্চম পরিচ্ছেদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক কুরআন সংরক্ষণ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর মহান আল্লাহর বাণী: "পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে" [আলাক: ১] এবং জিবরাঈলের সেই ঘোষণা: "হে মুহাম্মদ! আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর সত্য রাসূল" নাযিল হওয়ার পর তিনি তাঁর নতুন দায়িত্বের স্বরূপ উপলব্ধি করেন। অতঃপর নাযিল হলো আল্লাহর বাণী: "হে চাদরাবৃত! (১) ওঠুন এবং সতর্ক করুন (২)" [মুদ্দাসসির]। তিনি বুঝতে পারলেন যে, তাঁকে ঐশী রিসালাত বহন করতে হবে এবং তাঁর চারপাশের মানুষের কাছে এর দাওয়াত পৌঁছাতে হবে। জিবরাঈল (আ.)-এর কাছ থেকে কুরআন গ্রহণের পদ্ধতিটি এমন ছিল যে, তা গ্রহণের মুহূর্তে তিলাওয়াত ও হিফজ করার সুযোগ থাকত না। এই অবস্থাটি ফেরেশতার কাছ থেকে ওহি (وحي) গ্রহণের সময় কুরআনের কোনো শব্দ হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তাঁর মনে উদ্বেগ ও আশঙ্কা সৃষ্টি করত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুরুর দিকে কুরআন হিফজ করার জন্য তাড়াহুড়ো করতেন। ওহির (وحي) সময়ে জিবরাঈল যখন তাঁর কাছে কুরআন পেশ করতেন, তখন তিনি তাঁর সাথে পাল্লা দিতেন। ফেরেশতা শেষ করার আগেই তিনি আয়াতগুলো বারবার পড়তেন এই ভয়ে যে, পাছে তিনি এর কিছু অংশ ভুলে না যান। এটি তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ছিল। ফলে কুরআন তাঁকে প্রথম দিকে আশ্বস্ত করতে নাযিল হলো...

--------------------------------------------

(১) সহিহ মুসলিম বি-শারহিন নববী ১২/ ১২৮, এবং বায়হাকি: দালায়েলুন নুবুওয়াহ ৭/ ৫৪।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ২৭)
الطريق، ويتكفل له بالحفظ المطلق للقرآن، وينهاه عن تلك العجلة، قال الله تعالى: وَكَذلِكَ أَنْزَلْناهُ قُرْآناً عَرَبِيًّا وَصَرَّفْنا فِيهِ مِنَ الْوَعِيدِ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ أَوْ يُحْدِثُ لَهُمْ ذِكْراً (113) فَتَعالَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ وَلا تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يُقْضى إِلَيْكَ وَحْيُهُ وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْماً (114) [طه].

وجاءت آيات أخرى تؤكد أن حفظ القرآن مكفول للنبي صلى الله عليه وسلم وهي قوله تعالى: لا تُحَرِّكْ بِهِ لِسانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ (16) إِنَّ عَلَيْنا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ (17) فَإِذا قَرَأْناهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ (18) ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنا بَيانَهُ (19) [القيامة].

وقد روى البخاري في صحيحه تفسيرا لهذه الآيات عن عبد الله بن عباس، رضي الله عنهما، جاء فيه: إن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يعالج من التنزيل شدّة، وكان مما يحرك به لسانه وشفتيه، يخشى أن ينفلت منه، فأنزل الله لا تُحَرِّكْ بِهِ لِسانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ (16) إِنَّ عَلَيْنا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ (17) جمعه: أن نجمعه في صدرك (أي أن تحفظه) وقرآنه: أن تقرأه. فَإِذا قَرَأْناهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ (18): فإذا أنزلناه فاستمع وأنصت. ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنا بَيانَهُ (19): ثم إن علينا أن نبيّنه بلسانك، فكان رسول الله صلى الله عليه وسلم بعد ذلك إذا أتاه جبريل استمع، فإذا انطلق جبريل قرأه النبي صلى الله عليه وسلم كما قرأه جبريل (1).

وهذه الآيات الكريمة تؤكد أمرا هامّا، هو تكفّل الله المطلق بشأن القرآن، وحيا وحفظا وجمعا وبيانا، وإسناده إليه- سبحانه- بكليته، فليس للرسول صلى الله عليه وسلم من أمره إلا وعيه وحفظه وتبليغه، بعد أن أعطاه الله ملكة تامة للحفظ، فصار إذا أتاه جبريل استمع، فإذا ذهب جبريل قرأه كما قرأه عليه جبريل، يحفظ السورة الطويلة كما يحفظ السورة القصيرة، وليس هناك فرصة لنسيان شيء منه أو ضياعه.

وإلى جانب هذا الاستعداد الدائم الذي خص الله به النبي صلى الله عليه وسلم لحفظ القرآن، فإن جبريل عليه السلام كان يدارسه ما نزل عليه من القرآن في كل مرة، كما في الحديث

--------------------------------------------

(1) صحيح البخاري 1/ 6 و 6/ 202، وابن سعد: الطبقات الكبرى 1/ 198.
পথের দিশা প্রদান করেন এবং তাঁর জন্য কুরআনের নিরঙ্কুশ সংরক্ষণ (حفظ)-এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর তাঁকে সেই তাড়াহুড়া করতে নিষেধ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর এভাবেই আমি তা অবতীর্ণ করেছি আরবি কুরআন হিসেবে এবং তাতে নানাবিধ সতর্কবাণী ব্যক্ত করেছি, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে অথবা তা তাদের মধ্যে চেতনার উদ্রেক করে (১১৩)। অতএব আল্লাহ অতি উচ্চ, প্রকৃত মালিক। আর আপনার প্রতি ওহী (وحي) সমাপ্ত হওয়ার পূর্বে আপনি কুরআন পাঠে তাড়াহুড়া করবেন না এবং বলুন, ‘হে আমার রব, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন’ (১১৪)" [ত্বহা]।

আরও কিছু আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে যা নিশ্চিত করে যে, কুরআনের সংরক্ষণ (حفظ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য সুনিশ্চিত করা হয়েছে। আর তা হলো আল্লাহ তাআলার বাণী: "তাড়াহুড়া করার জন্য আপনি আপনার জিহ্বা এর দ্বারা নাড়াচাড়া করবেন না (১৬)। নিশ্চয়ই এটি সংরক্ষণ (جمع) করা এবং পাঠ করানোর দায়িত্ব আমারই (১৭)। অতএব আমি যখন তা পাঠ করি, আপনি সেই পাঠ অনুসরণ করুন (১৮)। অতঃপর এর বিশদ বর্ণনা (بيان) করার দায়িত্বও আমারই (১৯)" [কিয়ামাহ]।

ইমাম বুখারি তাঁর সহীহ গ্রন্থে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে এই আয়াতগুলোর একটি তাফসীর বর্ণনা করেছেন, যাতে বলা হয়েছে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহী (وحي) অবতীর্ণ (تنزيل) হওয়ার সময় অনেক কষ্ট সহ্য করতেন এবং প্রায়ই তাঁর জিহ্বা ও ওষ্ঠদ্বয় নাড়াতেন এই ভয়ে যে, পাছে তা তাঁর থেকে হারিয়ে যায়। তখন আল্লাহ নাযিল করলেন: ‘তাড়াহুড়া করার জন্য আপনি আপনার জিহ্বা এর দ্বারা নাড়াচাড়া করবেন না (১৬)। নিশ্চয়ই এটি সংরক্ষণ (جمع) করা এবং পাঠ করানোর দায়িত্ব আমারই (১৭)’। এর অর্থ: এটি আপনার বক্ষস্থলে পুঞ্জীভূত করা (অর্থাৎ আপনি তা মুখস্থ করবেন) এবং পাঠ করানো। ‘অতএব আমি যখন তা পাঠ করি, আপনি সেই পাঠ অনুসরণ করুন (১৮)’: অর্থাৎ যখন আমি তা নাযিল করি, তখন আপনি মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করুন এবং নিশ্চুপ থাকুন। ‘অতঃপর এর বিশদ বর্ণনা (بيان) করার দায়িত্বও আমারই (১৯)’: অর্থাৎ আপনার যবানে তা ব্যক্ত করার দায়িত্বও আমার। এরপর থেকে যখন জিবরাঈল (আ.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট আসতেন, তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। জিবরাঈল (আ.) চলে গেলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা ঠিক সেভাবেই পাঠ করতেন যেমনটি জিবরাঈল (আ.) পাঠ করেছিলেন (১)।

এই মহিমান্বিত আয়াতসমূহ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিশ্চিত করে, আর তা হলো কুরআনের ওহী (وحي), সংরক্ষণ (حفظ), সংকলন (جمع) এবং বর্ণনার (بيان) ক্ষেত্রে আল্লাহর নিরঙ্কুশ জিম্মাদারি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এর পূর্ণ বিষয়টিকে তাঁর নিজের দিকে সম্বন্ধযুক্ত করেছেন। ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাজ কেবল তা অনুধাবন করা, সংরক্ষণ (حفظ) করা এবং পৌঁছে দেওয়া। আল্লাহ তাঁকে মুখস্থ করার পূর্ণ শক্তি দান করেছিলেন, যার ফলে জিবরাঈল (আ.) যখন আসতেন তিনি শ্রবণ করতেন এবং জিবরাঈল (আ.) চলে গেলে তিনি তা সেভাবেই তিলাওয়াত করতেন যেভাবে জিবরাঈল (আ.) তিলাওয়াত করেছিলেন। তিনি দীর্ঘ সূরা ঠিক সেভাবেই মুখস্থ রাখতেন যেভাবে ছোট সূরা মুখস্থ রাখতেন। এতে কোনো কিছু ভুলে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়ার কোনো অবকাশ ছিল না।

কুরআন সংরক্ষণের (حفظ) জন্য আল্লাহ তাআলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে যে স্থায়ী প্রস্তুতি প্রদান করেছিলেন, তার পাশাপাশি জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) প্রতিবার তাঁর কাছে অবতীর্ণ কুরআনের মুদারাসা বা পুনরাবৃত্তি (مدارسة) করতেন, যেমনটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

--------------------------------------------

(১) সহীহ বুখারী ১/৬ এবং ৬/২০২; ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা ১/১৯৮।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ২৮)
الذي رواه البخاري عن ابن عباس، حيث قال: «كان رسول الله أجود الناس، وكان أجود ما يكون في رمضان حين يلقاه جبريل، وكان يلقاه في كل ليلة من رمضان، فيدارسه القرآن، فلرسول الله صلى الله عليه وسلم أجود بالخير من الريح المرسلة» (1).

وكانت ثمرة ذلك التمكين لحفظ القرآن، وهذه المدارسة له بين رسول الله وجبريل أن حفظ رسول الله صلى الله عليه وسلم القرآن حفظا لا حظّ للنسيان فيه، قال مجاهد:

كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يتذكر القرآن في نفسه، مخافة أن ينسى، فقال الله عز وجل:

سَنُقْرِئُكَ فَلا تَنْسى (6) [الأعلى]» (2). فقرأه على الصحابة، فكان بعضهم يكتبه، وكان آخرون يحفظونه، وأدّوه إلى من جاء بعدهم من أجيال المسلمين، وظل القرآن محفوظا كما تلقاه الصحابة عن رسول الله صلى الله عليه وسلم حتى يومنا هذا.

 

‌‌المبحث السادس تنجيم القرآن والحكمة منه

‌‌أولا- نزول القرآن منجّما:

لم ينزل القرآن الكريم على رسول الله صلى الله عليه وسلم مرة واحدة، وإنما نزل مفرّقا، وظل جبريل ينزل عليه بالقرآن مدة ثلاث وعشرين سنة، في الرأي الراجح، فقد روى البخاري عن عبد الله بن عباس أنه قال: «بعث رسول الله صلى الله عليه وسلم لأربعين سنة، فمكث بمكة ثلاث عشرة سنة يوحى إليه، ثم أمر بالهجرة، فهاجر عشر سنين، ومات وهو ابن ثلاث وستين» (3).

ونزول القرآن مفرقا يسميه العلماء تنجيم القرآن، ويسمّون الشيء النازل منه في المرة الواحدة نجما، لأن من معاني النجم في اللغة «الوقت المضروب» وقد

--------------------------------------------

(1) صحيح البخاري 1/ 6. وينظر: البيهقي: دلائل النبوة 7/ 146.

(2) تفسير مجاهد ص 752. وينظر: الطبري: جامع البيان 30/ 154.

(3) ابن حجر: فتح الباري 7/ 227، وينظر: الترمذي: كتاب السنن 5/ 552.
যা ইমাম বুখারি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, যেখানে তিনি বলেছেন: «রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল, আর রমজান মাসে যখন জিবরাইল (আ.) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন, তখন তিনি আরও অধিক দানশীল হতেন। জিবরাইল (আ.) রমজানের প্রতি রাতে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং তাঁরা পরস্পর কুরআন পাঠ (মুদারাসাহ) করতেন। নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (সা.) কল্যাণকর কাজে প্রবাহিত বায়ুর (المرسلة) চেয়েও অধিক দানশীল ছিলেন» (১)।

কুরআন হিফয করার এই সক্ষমতা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) ও জিবরাইল (আ.)-এর মধ্যকার এই পারস্পরিক পাঠাভ্যাসের ফল ছিল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) কুরআন এমনভাবে হিফয করেছিলেন যাতে বিস্মৃতির কোনো অবকাশ ছিল না। মুজাহিদ (রহ.) বলেন:

রাসূলুল্লাহ (সা.) ভুলে যাওয়ার আশঙ্কায় মনে মনে কুরআন স্মরণ করতেন, তখন আল্লাহ তাআলা বললেন:

«আমি আপনাকে পাঠ করাব, ফলে আপনি বিস্মৃত হবেন না (৬) [আল-আলা]» (২)। অতঃপর তিনি তা সাহাবিদের সামনে পাঠ করতেন, ফলে তাঁদের কেউ কেউ তা লিখে নিতেন এবং অন্যরা তা মুখস্থ করে রাখতেন। তাঁরা পরবর্তী প্রজন্মের মুসলিমদের কাছে তা পৌঁছে দিয়েছেন। ফলে সাহাবিগণ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে যেভাবে কুরআন লাভ করেছিলেন, আজ অবধি কুরআন সেভাবেই সংরক্ষিত রয়েছে।

 

‌‌ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: কুরআনের পর্যায়ক্রমিক অবতরণ (تنجيم القرآن) এবং এর হিকমত

‌‌প্রথমত- পর্যায়ক্রমে (منجّما) কুরআন অবতরণ:

কুরআন কারীম রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর একবারে অবতীর্ণ হয়নি, বরং তা পৃথক পৃথকভাবে অবতীর্ণ হয়েছে। প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত (الرأي الراجح) অনুযায়ী, জিবরাইল (আ.) তেইশ বছর ধরে তাঁর ওপর কুরআন নিয়ে অবতরণ অব্যাহত রাখেন। বুখারি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: «রাসূলুল্লাহ (সা.) চল্লিশ বছর বয়সে প্রেরিত হন। এরপর তিনি মক্কায় তেরো বছর অবস্থান করেন যখন তাঁর ওপর ওহী অবতীর্ণ হতো। এরপর তাঁকে হিজরতের নির্দেশ দেওয়া হয়, ফলে তিনি দশ বছর হিজরত (অবস্থান) করেন এবং তেষট্টি বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন» (৩)।

পৃথক পৃথকভাবে কুরআনের এই অবতীর্ণ হওয়াকে আলেমগণ কুরআনের পর্যায়ক্রমিক অবতরণ (تنجيم القرآن) বলে অভিহিত করেন এবং একবারে অবতীর্ণ অংশকে তাঁরা একটি কিস্তি (نجم) বলেন। কারণ লভিধানিক অর্থে 'নাজম' (النجم) এর অন্যতম অর্থ হলো 'নির্ধারিত সময়'।

--------------------------------------------

(১) সহিহ বুখারি ১/৬। আরও দেখুন: বায়হাকি: দালায়েলুন নুবুওয়াহ ৭/১৪৬।

(২) তাফসিরে মুজাহিদ, পৃষ্ঠা ৭৫২। আরও দেখুন: তাবারী: জামিউল বয়ান ৩০/১৫৪।

(৩) ইবনে হাজার: ফাতহুল বারী ৭/২২৭, আরও দেখুন: তিরমিজি: সুনান ৫/৫৫২।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ২৯)
قالت العرب: «نجّمت المال، إذا أدّيته نجوما … وقد جعل فلان ماله على فلان نجوما معدودة يؤدي عند انقضاء كل شهر منها نجما، وقد نجّمها عليه تنجيما» (1). قال أبو شامة المقدسي: «فلما قطّع الله سبحانه القرآن وأنزله مفرقا قيل لتفاريقه نجوم» (2).

وأثار المشركون مسألة نزول القرآن منجما في سلسلة معارضتهم الباطلة للنبي صلى الله عليه وسلم وتمنوا نزول القرآن جملة واحدة، على نحو ما حكى القرآن في قوله تعالى: وَقالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً واحِدَةً كَذلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤادَكَ وَرَتَّلْناهُ تَرْتِيلًا (32) وَلا يَأْتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلَّا جِئْناكَ بِالْحَقِّ وَأَحْسَنَ تَفْسِيراً (33) [الفرقان].

وللعلماء والمفسرين تحقيقات في الجهة التي ينزل منها جبريل عليه السلام بالقرآن على النبي صلى الله عليه وسلم وهذه قضية تستند أساسا إلى ما ورد عنها في القرآن الكريم، ويعتقد العلماء أن القرآن مثبت عند الله تعالى في أم الكتاب، في اللوح المحفوظ، مستندين في ذلك إلى قوله تعالى: حم (1) وَالْكِتابِ الْمُبِينِ (2) إِنَّا جَعَلْناهُ قُرْآناً عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ (3) وَإِنَّهُ فِي أُمِّ الْكِتابِ لَدَيْنا لَعَلِيٌّ حَكِيمٌ (4) [الزخرف]، وقوله تعالى: بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَجِيدٌ (21) فِي لَوْحٍ مَحْفُوظٍ (22) [البروج]. قال المفسرون: إن القرآن مثبت عند الله سبحانه في اللوح المحفوظ، وسمّي أمّ الكتاب لأنه الأصل الذي أثبتت فيه الكتب السماوية (3). وقد حمل بعض المفسرين قوله تعالى: إِنَّهُ لَقُرْآنٌ كَرِيمٌ (77) فِي كِتابٍ مَكْنُونٍ (78) لا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ (79) [الواقعة] على اللوح المحفوظ، والمطهرون الملائكة (4).

--------------------------------------------

(1) ابن منظور: لسان العرب 16/ 47 نجم.

(2) المرشد الوجيز ص 18.

(3) ينظر: الطبري: جامع البيان 25/ 48 و 30/ 140، والنسفي: مدرك التنزيل 4/ 113، والبيضاوي: أنوار التنزيل 2/ 368.

(4) ينظر: الطبري: جامع البيان 27/ 203.
আরবরা বলে: "আমি অর্থ কিস্তিতে (نجوم) পরিশোধ করেছি, যখন তুমি তা কিস্তি আকারে আদায় কর ... অমুক ব্যক্তি তার অর্থ অপর ব্যক্তির ওপর নির্দিষ্ট কিস্তি হিসেবে ধার্য করেছে, যার প্রতিটি মাসের শেষে সে একটি করে কিস্তি আদায় করবে। সে তার ওপর কিস্তি অনুযায়ী বিষয়টি নির্ধারণ (تنجيم) করেছে।" (১)। আবু শামাহ আল-মাকদিসি বলেন: "মহান আল্লাহ যখন কুরআনকে খণ্ডিত করেছেন এবং তা পৃথক পৃথকভাবে (مفرق) অবতীর্ণ করেছেন, তখন এই খণ্ডাংশগুলোকে কিস্তি (نجوم) বলা হয়েছে।" (২)।

আর মুশরিকরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি তাদের অমূলক বিরোধিতার ধারাবাহিকতায় কুরআন কিস্তি আকারে (منجم) অবতীর্ণ হওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করেছিল এবং তারা কুরআন একযোগে (جملة واحدة) অবতীর্ণ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেছিল; যেমনটি কুরআন মহান আল্লাহর এই বাণীতে বর্ণনা করেছে: "আর কাফিররা বলে, তার ওপর কেন পুরো কুরআন একযোগে (جملة واحدة) অবতীর্ণ করা হলো না? এভাবেই (আমি অবতীর্ণ করেছি), যাতে আমি এর মাধ্যমে তোমার অন্তরকে সুদৃঢ় করি এবং আমি তা স্পষ্টভাবে আবৃত্তি করেছি (৩২) আর তারা তোমার কাছে এমন কোনো দৃষ্টান্ত নিয়ে আসে না যার সঠিক সমাধান ও সুন্দর ব্যাখ্যা আমি তোমাকে দান করি না (৩৩)" [আল-ফুরকান]।

জিবরাঈল আলাইহিস সালাম কোন দিক থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কুরআন নিয়ে আসতেন, সে বিষয়ে আলিম ও মুফাসসিরদের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ রয়েছে। এই বিষয়টি মূলত কুরআন মাজীদে যা বর্ণিত হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। আলিমগণ বিশ্বাস করেন যে, কুরআন মহান আল্লাহর কাছে 'উম্মুল কিতাব' অর্থাৎ 'লাওহে মাহফূজ'-এ সংরক্ষিত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তারা মহান আল্লাহর এই বাণীর ওপর নির্ভর করেন: "হা-মীম (১) শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের (২) নিশ্চয়ই আমি একে আরবি কুরআন বানিয়েছি যাতে তোমরা বুঝতে পারো (৩) আর নিশ্চয়ই তা আমাদের কাছে উম্মুল কিতাবে অত্যন্ত উচ্চমর্যাদাপূর্ণ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ (৪)" [আয-জুখরুফ]। এবং মহান আল্লাহর বাণী: "বরং এটি মহিমান্বিত কুরআন (২১) যা লাওহে মাহফূজ বা সংরক্ষিত ফলকে লিপিবদ্ধ (২২)" [আল-বুরূজ]। মুফাসসিরগণ বলেন: নিশ্চয়ই কুরআন মহান আল্লাহর কাছে লাওহে মাহফূজে সংরক্ষিত। আর একে 'উম্মুল কিতাব' বলা হয় কারণ এটিই সেই উৎস যেখানে আসমানী কিতাবসমূহ সংরক্ষিত রয়েছে (৩)। কোনো কোনো মুফাসসির মহান আল্লাহর বাণী: "নিশ্চয়ই এটি এক সম্মানিত কুরআন (৭৭) যা এক সুরক্ষিত কিতাবে রয়েছে (৭৮) পবিত্রগণ ব্যতীত কেউ তা স্পর্শ করে না (৭৯)" [আল-ওয়াকিয়াহ]-এর অর্থ লাওহে মাহফূজ হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং 'পবিত্রগণ' দ্বারা ফেরেশতাদের বুঝিয়েছেন (৪)।

--------------------------------------------

(১) ইবনে মানযুর: লিসানুল আরব ১৬/ ৪৭ (নজম)।

(২) আল-মুরশিদ আল-ওয়াজিয, পৃ. ১৮।

(৩) দেখুন: তাবারী: জামিউল বায়ান ২৫/ ৪৮ ও ৩০/ ১৪০, এবং নাসাফী: মাদারিকুত তানযীল ৪/ ১১৩, এবং বায়যাবী: আনওয়ারুত তানযীল ২/ ৩৬৮।

(৪) দেখুন: তাবারী: জামিউল বায়ান ২৭/ ২০৩।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ৩০)
ويعتقد كثير من العلماء والمفسرين أن القرآن أنزل جملة واحدة من اللوح المحفوظ إلى السماء الدنيا، وكان جبريل عليه السلام ينزل بالقرآن بعد ذلك مفرقا على النبي صلى الله عليه وسلم وكانوا في ذلك يستندون إلى تفسير عدد من الآيات الكريمة التي تتحدث عن إنزال القرآن الكريم، وهي قوله تعالى:

شَهْرُ رَمَضانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ (185) [البقرة].

حم (1) وَالْكِتابِ الْمُبِينِ (2) إِنَّا أَنْزَلْناهُ فِي لَيْلَةٍ مُبارَكَةٍ (3) [الدخان].

إِنَّا أَنْزَلْناهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ (1) [القدر].

وهذه الآيات الكريمة تتحدث عن وقت نزول القرآن، ولا تشير إلى الكيفية إلا إشارة عامة، كما أشارت آيات أخرى إلى هذا المعنى أيضا، لكن المفسرين ينقلون عن عبد الله بن عباس، رضي الله عنهما، أنه فسّر هذه الآيات بقوله:

«أنزل الله تعالى القرآن كله جملة واحدة في ليلة القدر، وهي الليلة المباركة، في شهر رمضان إلى السماء الدنيا، ثم نزل به جبريل عليه السلام مفرقا على النبي صلى الله عليه وسلم في ثلاث وعشرين سنة، حتى أتمّه (1).

ونقل المفسرون قولا آخر في تفسير هذه الآيات عن أحد كبار التابعين هو عامر بن شراحيل الشعبي (ت 103 هـ على خلاف) الذي قال: نزل أول القرآن في ليلة القدر، ثم نزل بعد ذلك منجما في أوقات مختلفة (2). وقد قال ابن حجر: إن القول المعتمد الصحيح هو أن القرآن نزل جملة واحدة من اللوح المحفوظ إلى السماء الدنيا، ثم أنزل بعد ذلك مفرقا (3).

--------------------------------------------

(1) ينظر: الطبري: جامع البيان 2/ 144 و 25/ 107 و 30/ 258. وأبو شامة: المرشد الوجيز ص 17، والسيوطي: الإتقان 1/ 116.

(2) ينظر: الطبري: جامع البيان 30/ 258، والسيوطي: الإتقان 1/ 118.

(3) فتح الباري: 9/ 4.
অনেক আলেম ও মুফাসসির বিশ্বাস করেন যে, কুরআন লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে একবারে নাযিল করা হয়েছে। এরপর জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) খণ্ড খণ্ড ভাবে তা নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট নিয়ে আসতেন। এ বিষয়ে তারা বেশ কিছু আয়াতের তাফসিরের ওপর নির্ভর করেন যা কুরআন নাযিল হওয়া সম্পর্কে আলোচনা করে। সেগুলো হলো আল্লাহ তাআলার বাণী:

রমজান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে (১৮৫) [সূরা বাকারা]।

হা-মীম। (১) শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। (২) নিশ্চয়ই আমি এটি এক বরকতময় রাতে নাযিল করেছি (৩) [সূরা আদ-দুখান]।

নিশ্চয়ই আমি এটি কদরের রাতে নাযিল করেছি (১) [সূরা আল-কদর]।

এই আয়াতগুলো কুরআন নাযিলের সময় সম্পর্কে আলোচনা করে এবং সাধারণ ইঙ্গিত ছাড়া নাযিল হওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলে না, যেমনটি অন্য কিছু আয়াতেও এই অর্থের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তবে মুফাসসিরগণ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় বলেছেন:

«আল্লাহ তাআলা পুরো কুরআন কদরের রাতে—যা রমজান মাসের একটি বরকতময় রাত—একবারে দুনিয়ার আকাশে নাযিল করেছেন। অতঃপর জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) তা তেইশ বছর ধরে খণ্ড খণ্ড ভাবে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট নিয়ে আসেন, যতক্ষণ না তিনি তা পূর্ণ করেন (১)।

মুফাসসিরগণ এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাবেয়ি আমির ইবনে শারাহিল আশ-শাবি (মৃত্যু ১০৩ হিজরি, মতভেদ আছে) থেকে অন্য একটি অভিমত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: কুরআনের প্রথম অংশ কদরের রাতে নাযিল হয়েছে, এরপর বিভিন্ন সময়ে ধাপে ধাপে তা নাযিল হয়েছে (২)। ইবনে হাজার বলেছেন: নির্ভরযোগ্য (المعتمد) ও বিশুদ্ধ (الصحيح) মত হলো, কুরআন লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে একবারে নাযিল হয়েছে এবং এরপর তা খণ্ড খণ্ড ভাবে নাযিল করা হয়েছে (৩)।

--------------------------------------------

(১) দেখুন: তাবারি: জামিউল বায়ান ২/ ১৪৪, ২৫/ ১০৭ এবং ৩০/ ২৫৮। আবু শামা: আল-মুরশিদ আল-ওয়াজিজ পৃ. ১৭ এবং সুয়ূতি: আল-ইতকান ১/ ১১৬।

(২) দেখুন: তাবারি: জামিউল বায়ান ৩০/ ২৫৮ এবং সুয়ূতি: আল-ইতকান ১/ ১১৮।

(৩) ফাতহুল বারি: ৯/ ৪।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ৩১)
وقال أبو شامة المقدسي: إنه لا منافاة بين الآيات الثلاث، فليلة القدر هي الليلة المباركة، وهي في شهر رمضان (1). ثم قال: «إن أول ما نزل على النبي صلى الله عليه وسلم اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ (1) وذلك بحراء عند ابتداء نبوته، ويجوز أن يكون قوله أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ (185) [البقرة] إشارة إلى كل ذلك، وهو كونه أنزل جملة إلى السماء الدنيا، وأول نزوله إلى الأرض، وعرضه وإحكامه، في شهر رمضان، فقويت ملابسة شهر رمضان للقرآن إنزالا جملة وتفصيلا وعرضا وإحكاما، فلم يكن شيء من الأزمان تحقق له من الظرفية للقرآن ما تحقق لشهر رمضان، فلمجموع هذه المعاني قيل أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ» (2).

ولا شك في أن نزول القرآن جملة إلى السماء الدنيا هو من أمر الغيب الذي تتوقف معرفته على ورود نص في القرآن أو الحديث يبينه، ولكن قول الصحابي في الأمور التي ليست موضع اجتهاد، إذا ثبت، حكمه حكم الحديث المرفوع، وهو ما ينطبق على تفسير ابن عباس هنا، فقد نص السيوطي على صحة أسانيد الأحاديث التي نقلت ذلك التفسير عن ابن عباس (3). فمن المرجح أن يكون ابن عباس قد فهم التفسير من النبي صلى الله عليه وسلم.

على أن مما يجب الالتفات إليه في موضوع نزول القرآن هو أن هذا الاختلاف في تفسير هذه الآيات لا يؤثر في شيء على نص القرآن الكريم، فسواء ثبت ما نقل عن ابن عباس أو ما روي عن عامر الشعبي فنص القرآن واحد في كلا القولين، وهما يؤولان إلى نتيجة واحدة وهي أن النبي صلى الله عليه وسلم تلقى القرآن مفرقا في ثلاث وعشرين سنة، لكن العلماء قالوا إن في إنزاله جملة إلى السماء الدنيا «تفخيم لأمره وأمر من أنزل عليه، وذلك بإعلام سكان السماوات السبع أن هذا

--------------------------------------------

(1) المرشد الوجيز ص 9.

(2) المصدر نفسه ص 24.

(3) الاتقان 1/ 117.
আবু শামাহ আল-মাকদিসি বলেন: এই তিনটি আয়াতের মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই, কারণ লাইলাতুল কদরই হলো বরকতময় রাত, আর তা রমজান মাসে অবস্থিত (১)। এরপর তিনি বলেন: "নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর সর্বপ্রথম যা অবতীর্ণ হয়েছে তা হলো ‘ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক’ (১), আর তা তাঁর নবুওয়াতের শুরুতে হেরা গুহায় সংঘটিত হয়েছিল। আর এটি সম্ভব যে, ‘যাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে’ [আল-বাকারা: ১৮৫] এই বাণীর মাধ্যমে এসব কিছুর প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে; অর্থাৎ একত্রে (جملة) দুনিয়ার আসমানে অবতীর্ণ হওয়া, জমিনে এর অবতরণের সূচনা, এর উপস্থাপন ও সুসংবদ্ধকরণ—সবই রমজান মাসে হয়েছে। ফলে একত্রে (جملة) অবতরণ, বিস্তারিতভাবে অবতরণ, উপস্থাপন ও সুসংবদ্ধকরণের দিক থেকে রমজান মাসের সাথে কুরআনের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে কুরআনের প্রেক্ষাপট বা সময়কাল হিসেবে রমজান মাস যে মর্যাদা লাভ করেছে, অন্য কোনো সময় তা পায়নি। এই সামগ্রিক বিষয়াবলীর কারণেই বলা হয়েছে—‘যাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে’" (২)।

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, দুনিয়ার আসমানে একত্রে (جملة) কুরআন অবতীর্ণ হওয়া একটি গায়েবি বা অদৃশ্যের বিষয়, যার জ্ঞান লাভ করা কুরআন বা হাদিসের সুস্পষ্ট বর্ণনার (نص) ওপর নির্ভরশীল। তবে সাহাবীর বক্তব্য যদি এমন বিষয়ে হয় যা ইজতিহাদ বা গবেষণার ক্ষেত্র নয়, এবং যদি তা সাব্যস্ত হয়, তবে তার বিধান হবে মারফু (المرفوع) হাদিসের মতো। আর এটি ইবনে আব্বাসের এই তাফসিরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ইমাম সুয়ূতী ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত এই তাফসির সংবলিত হাদিসগুলোর সনদসমূহের (أسانيد) বিশুদ্ধতা (صحة) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন (৩)। সুতরাং এটিই অধিকতর যুক্তিযুক্ত যে, ইবনে আব্বাস এই তাফসির নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকেই অনুধাবন করেছেন।

তবে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রসঙ্গে যে বিষয়টি লক্ষ্য রাখা উচিত তা হলো—এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় এই মতপার্থক্য পবিত্র কুরআনের মূল পাঠের (نص) ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত মতটি সাব্যস্ত হোক কিংবা আমির আশ-শা’বি থেকে বর্ণিত মতটিই হোক, উভয় ক্ষেত্রেই কুরআনের মূল পাঠ (نص) অভিন্ন। আর উভয় মতই একই ফলাফলে উপনীত হয় যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তেইশ বছরে খণ্ড খণ্ড ভাবে কুরআন প্রাপ্ত হয়েছেন। তবে উলামাগণ বলেন যে, দুনিয়ার আসমানে একত্রে (جملة) এটি অবতীর্ণ করার মধ্যে "কুরআনের এবং যাঁর ওপর এটি অবতীর্ণ হয়েছে তাঁর মর্যাদার মহিমা ঘোষণা করা হয়েছে; আর তা হলো সাত আসমানের অধিবাসীদের জানিয়ে দেওয়া যে এটি...

--------------------------------------------

(1) আল-মুরশিদ আল-ওয়াজিজ, পৃষ্ঠা ৯।

(2) একই উৎস, পৃষ্ঠা ২৪।

(3) আল-ইতকান ১/১১৭।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ৩২)
آخر الكتب، المنزل على خاتم الرسل، لأشرف الأمم، قد قربناه إليهم لننزله عليهم، ولولا أن الحكمة الإلهية اقتضت وصوله إليهم منجما بحسب الوقائع لهبط به إلى الأرض جملة كسائر الكتب المنزلة قبله، ولكن الله تعالى باين بينه وبينها، فجمع له الأمرين: إنزاله جملة ثم إنزاله مفرقا» (1)».

 

‌‌ثانيا- حكمة نزول القرآن منجما:

استغرق نزول القرآن الكريم ثلاثا وعشرين سنة، فهو لا يشكل ظاهرة مؤقتة أو خاطفة، ولقد نزلت الآيات منجمة، قد تنزل السورة الكاملة أو الآيات، أو الآية الواحدة، وبين كل وحي وما يليه مدة انقطاع قد تطول وقد تقصر، بحسب التقدير الإلهي، لا برغبة النبي صلى الله عليه وسلم فإن رسول الله صلى الله عليه وسلم لم يكن يملك من أمر الوحي غير التلقي الواعي، ثم الحفظ والتبليغ. فالله سبحانه هو الذي اختار هذا الطريق لتنزيل القرآن. وقد تمنى الكفار نزول القرآن جملة واحدة، ولكن الله تعالى بيّن أن وراء نزوله مفرقا حكمة يتعلق بها استمرار الدعوة ونجاحها، فقال سبحانه: وَقالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً واحِدَةً كَذلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤادَكَ وَرَتَّلْناهُ تَرْتِيلًا (32) وَلا يَأْتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلَّا جِئْناكَ بِالْحَقِّ وَأَحْسَنَ تَفْسِيراً (33) [الفرقان].

ويقدم المفسرون لقوله تعالى: ما نُثَبِّتُ بِهِ فُؤادَكَ (120) [هود] تفسيرين، هما: (2) 1 - لنقوّي به قلبك، فإن الوحي إذا كان يتجدد في كل حادثة كان أقوى للقلب، وأشد عناية بالمرسل إليه.

2 - لتحفظه، فيكون فؤادك ثابتا به غير مضطرب، وكان النبي صلى الله عليه وسلم أميا لا يكتب ولا يقرأ، ففرّق عليه القرآن ليتيسر عليه حفظه.

--------------------------------------------

(1) أبو شامة: المرشد الوجيز ص 24، وينظر: السيوطي: الاتقان 1/ 119.

(2) ينظر: الطبري: جامع البيان 19/ 10، وأبو شامة: المرشد الوجيز ص 28، والسيوطي:

الاتقان 1/ 121.
সর্বশেষ কিতাব, যা রাসুলগণের মোহরের (خاتم الرسل) ওপর শ্রেষ্ঠতম উম্মতের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে, আমরা তা তাদের নিকটবর্তী করেছি যেন তা তাদের ওপর অবতীর্ণ করি। যদি ঐশী প্রজ্ঞা প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপটে এটি খণ্ড খণ্ডভাবে (منجما) পৌঁছানোর দাবি না করত, তবে পূর্ববর্তী অবতীর্ণ অন্যান্য কিতাবের ন্যায় এটিও পৃথিবীতে একবারে (جملة) অবতীর্ণ হতো। কিন্তু মহান আল্লাহ এই কিতাব ও পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর মধ্যে পার্থক্য করেছেন, ফলে তিনি এর জন্য দুটি বিষয়ই একত্র করেছেন: একবারে (جملة) অবতীর্ণ করা এবং পরবর্তীতে পৃথক পৃথকভাবে (مفرقا) অবতীর্ণ করা। (১)

 

‌‌দ্বিতীয়ত- কুরআন খণ্ড খণ্ডভাবে (منجما) অবতীর্ণ হওয়ার রহস্য:

পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হতে তেইশ বছর সময় লেগেছে, তাই এটি কোনো সাময়িক বা আকস্মিক বিষয় নয়। আয়াতগুলো খণ্ড খণ্ডভাবে (منجمة) অবতীর্ণ হয়েছে; কখনও পূর্ণাঙ্গ সুরা, কখনও কয়েকটি আয়াত, আবার কখনও একটি মাত্র আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। প্রতিবার ওহি (وحي) এবং এর পরবর্তী ওহির (وحي) মাঝে বিরতির সময়কাল ঐশী নির্ধারণ অনুযায়ী কখনও দীর্ঘ আবার কখনও সংক্ষিপ্ত হতো; এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইচ্ছানুসারে ছিল না। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওহি (وحي) সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনভাবে গ্রহণ (التلقي), অতঃপর তা সংরক্ষণ এবং পৌঁছে দেওয়া ব্যতীত আর কোনো এখতিয়ার ছিল না। সুতরাং মহান আল্লাহই কুরআন অবতীর্ণ করার জন্য এই পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। কাফেররা কুরআন একবারে (جملة واحدة) অবতীর্ণ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেছিল, কিন্তু মহান আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে, এর পৃথক পৃথকভাবে (مفرقا) অবতীর্ণ হওয়ার পেছনে এমন রহস্য নিহিত রয়েছে যার সাথে দাওয়াতের ধারাবাহিকতা ও সাফল্য জড়িত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন: “আর কাফিররা বলে, তার ওপর কুরআন একবারে (جملة واحدة) কেন নাযিল করা হলো না? এভাবেই (আমি নাযিল করেছি) তোমার অন্তরকে এর মাধ্যমে সুদৃঢ় করার জন্য এবং আমি তা ক্রমে ক্রমে সুস্পষ্টভাবে আবৃত্তি করেছি। (৩২) আর তারা তোমার কাছে এমন কোনো উপমা নিয়ে আসে না যার সঠিক ও সত্য সমাধান এবং সুন্দর ব্যাখ্যা (تفسيرا) আমি তোমাকে দান করিনি।” (৩৩) [সুরা আল-ফুরকান]।

মহান আল্লাহর বাণী: “যার মাধ্যমে আমি তোমার অন্তরকে সুদৃঢ় করি” [সুরা হুদ: ১২০]-এর বিষয়ে মুফাসসিরগণ (المفسرون) দুটি ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, সেগুলো হলো: (২) ১ - এর মাধ্যমে যেন আমি তোমার হৃদয়কে শক্তিশালী করি; কেননা ওহি (الوحي) যখন প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষিতে নতুনভাবে অবতীর্ণ হয়, তখন তা হৃদয়ের জন্য অধিক শক্তিশালী এবং যাঁর প্রতি তা পাঠানো হয়েছে তাঁর প্রতি অধিক যত্নের পরিচায়ক হয়।

২ - যেন তুমি তা মুখস্থ করতে পারো, ফলে তোমার অন্তর এর মাধ্যমে স্থির থাকে এবং দ্বিধাগ্রস্ত না হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মি (أميا) ছিলেন, তিনি লিখতে বা পড়তে পারতেন না; তাই তাঁর ওপর কুরআন খণ্ড খণ্ডভাবে অবতীর্ণ করা হয়েছে যেন তাঁর জন্য এর মুখস্থকরণ সহজ হয়।

--------------------------------------------

(১) আবু শামা: আল-মুরশিদ আল-ওয়াজিজ, পৃষ্ঠা ২৪; এবং দেখুন: সুয়ুতি: আল-ইতকান ১/১১৯।

(২) দেখুন: তাবারী: জামিউল বায়ান ১৯/১০, আবু শামা: আল-মুরশিদ আল-ওয়াজিজ, পৃষ্ঠা ২৮ এবং সুয়ুতি:

আল-ইতকান ১/১২১।
(খণ্ড: ১) মুহাযারাত ফি উলুমিল কুরআন - গানিম কাদ্দুরি (পৃষ্ঠা: ৩৩)
ولا شك أن تفريق النص الذي يراد حفظه ييسر الأمر على من يريد أن يحفظه، لكن ذلك قد لا ينطبق على الواقع، فقد صرح القرآن أن حفظ الوحي مكفول للنبي صلى الله عليه وسلم كما مر ذلك، والله تعالى يقول: سَنُقْرِئُكَ فَلا تَنْسى (6) [الأعلى] و (لا) هنا نافية، والآية تعني أنك تحفظه ولن تنساه، إِلَّا ما شاءَ اللَّهُ (188) [الأعراف].

والدارس اليوم والمتأمل لتاريخ الدعوة تتجلى أمامه حكمة نزول القرآن مفرقا، بالنسبة إلى النبي صلى الله عليه وسلم وبالنسبة إلى المؤمنين، فالدعوة الإسلامية جاءت لتصلح أوضاع البشرية الفاسدة في العقيدة والسلوك والتشريع، ولا يناسب تحقيق ذلك إلا الدعوة المتأنية، قال الله تعالى: وَبِالْحَقِّ أَنْزَلْناهُ وَبِالْحَقِّ نَزَلَ وَما أَرْسَلْناكَ إِلَّا مُبَشِّراً وَنَذِيراً (105) وَقُرْآناً فَرَقْناهُ لِتَقْرَأَهُ عَلَى النَّاسِ عَلى مُكْثٍ وَنَزَّلْناهُ تَنْزِيلًا (106) [الإسراء] أي لتقرأه على الناس على تؤدة، فترتله وتبينه ولا تعجل في تلاوته (1).

وتلك في الواقع هي الطريقة التربوية الوحيدة الممكنة في حقبة تتسم بميلاد دين وبزوغ حضارة، فكان الوحي خلال ثلاثة وعشرين عاما يهدي سير النبي صلى الله عليه وسلم وأصحابه خطوة خطوة نحو هذا الهدف، وهو يحوطهم كل لحظة بالعناية الإلهية المناسبة، فهو يعزز جهودهم، ويقوي إرادتهم، حتى تكلل ذلك الكفاح بالنصر المبين، فالحركة التاريخية والاجتماعية والروحية التي نهض بأعبائها الإسلام لا سر لها إلا في هذا التنجيم (2).

جاء هذا القرآن ليربي أمة، ويقيم لها نظاما، وجاء ليكون منهج تربية ومنهاج حياة، لا ليكون كتاب ثقافة يقرأ لمجرد الاستمتاع العقلي ولا لمجرد المعرفة، ومن ثم جاء هذا القرآن وفق الحاجات الحية للجماعة المسلمة، وهي في طريق نشأتها ونموها، ووفق استعدادها الذي كان ينمو يوما بعد يوم في ظل ذلك المنهج التربوي الإلهي الدقيق.

--------------------------------------------

(1) ينظر: الطبري: جامع البيان 15/ 179.

(2) مالك بن نبي: الظاهرة القرآنية ص 221 - 222.

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, যে পাঠ মুখস্থ করার সংকল্প করা হয় তা খণ্ড খণ্ড করে ভাগ করা মুখস্থকারীর জন্য বিষয়টি সহজ করে দেয়; কিন্তু এই বিষয়টি বাস্তব পরিস্থিতির সাথে নাও মিলতে পারে। কারণ কুরআন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, ওহি (وحي) সংরক্ষণ করার দায়িত্ব নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে, যেমনটি ইতিপূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: "আমি আপনাকে পাঠ করাব, ফলে আপনি ভুলবেন না" [আল-আ’লা: ৬]। এখানে (লা) বর্ণটি না-বোধক (نافية) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আয়াতটির অর্থ হলো—আপনি তা মুখস্থ রাখবেন এবং কখনোই ভুলবেন না, "আল্লাহ যা চান তা ব্যতীত" [আল-আ’রাফ: ১৮৮]।

বর্তমানে দা’ওয়াতের ইতিহাসের শিক্ষার্থী ও পর্যালোচনাকারীর সামনে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুমিনদের ক্ষেত্রে কুরআন খণ্ড খণ্ডভাবে অবতীর্ণ হওয়ার হিকমত বা প্রজ্ঞা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। কারণ ইসলামি দা’ওয়াত এসেছিল আকিদা, আচরণ এবং শরয়ি বিধানের ক্ষেত্রে মানবজাতির কলুষিত অবস্থাকে সংস্কার করতে। আর ধীরস্থির দা’ওয়াত ব্যতীত এই উদ্দেশ্য সফল হওয়া সম্ভব ছিল না। মহান আল্লাহ বলেন: "আমি সত্যসহই তা অবতীর্ণ করেছি এবং তা সত্যসহই অবতীর্ণ হয়েছে; আমি তো আপনাকে কেবল সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপেই প্রেরণ করেছি। আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি খণ্ড খণ্ডভাবে, যাতে আপনি তা মানুষের কাছে পাঠ করেন ধীরে ধীরে এবং আমি তা পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ করেছি" [আল-ইসরা: ১০৫-১০৬]। অর্থাৎ যাতে আপনি মানুষের সামনে তা ধীরস্থিরভাবে পাঠ করেন, ফলে তা স্পষ্টভাবে তিলাওয়াত করেন ও বর্ণনা করেন এবং তা তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করেন।

বস্তুত, একটি দ্বীনের জন্ম এবং একটি সভ্যতার উন্মেষের যুগে এটিই ছিল একমাত্র সম্ভবপর শিক্ষা পদ্ধতি। দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে ওহি (وحي) ধাপে ধাপে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীদের এই লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করেছে। এটি প্রতিটি মুহূর্তে উপযুক্ত খোদায়ি তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে তাঁদের পরিবেষ্টন করে রেখেছিল; এটি তাঁদের প্রচেষ্টাকে সুসংহত করেছে এবং তাঁদের ইচ্ছাশক্তিকে সুদৃঢ় করেছে, যতক্ষণ না সেই সংগ্রাম সুস্পষ্ট বিজয়ের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করেছে। সুতরাং ইসলাম যে ঐতিহাসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক আন্দোলনের গুরুদায়িত্ব পালন করেছিল, তার রহস্য কেবল এই পর্যায়ক্রমিক অবতরণের (تنجيم) মধ্যেই নিহিত ছিল।

এই কুরআন এসেছে একটি উম্মতকে গড়ে তুলতে এবং তাদের জন্য একটি ব্যবস্থা কায়েম করতে। এটি এসেছে একটি শিক্ষা পদ্ধতি ও জীবন বিধান হিসেবে; কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক আনন্দ বা নিছক জ্ঞান অর্জনের জন্য পঠিত কোনো সাংস্কৃতিক বই হিসেবে নয়। ফলশ্রুতিতে, এই কুরআন মুসলিম জামাতের বেড়ে ওঠা ও বিকাশের পথে তাদের জীবন্ত প্রয়োজন অনুযায়ী এবং সেই সুনিপুণ খোদায়ি শিক্ষা পদ্ধতির ছায়ায় দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া তাদের প্রস্তুতির অনুকূলে অবতীর্ণ হয়েছে।

--------------------------------------------

(১) দ্রষ্টব্য: তাবারী: জামিউল বায়ান ১৫/ ১৭৯।

(২) মালিক বিন নবী: আদ-দাহিরাতুল কুরআনিয়া, পৃষ্ঠা ২২১ - ২২২।