القسم: السيرة النبوية
الكتاب: تاريخ الخميس في أحوال أنفس النفيس
المؤلف: حسين بن محمد بن الحسن الدِّيار بَكْري [ت 966 هـ]
الناشر: المطبعة الوهبية، مصر - 1283 هـ
(وصورتها دور نشر مثل دار صادر - بيروت)
عدد الأجزاء: 2
[ترقيم الكتاب موافق للمطبوع]
تاريخ النشر بالشاملة: 8 ذو الحجة 1431
বিভাগ: সীরাতুন নবী (সা.)
গ্রন্থ: তারিখুল খামিস ফি আহওয়ালি আনফাসিন নাফিস
লেখক: হুসাইন বিন মুহাম্মাদ বিন আল-হাসান আদ-দিয়ার বাকরি [মৃ. ৯৬৬ হি.]
প্রকাশক: আল-মাতবাআতুল ওয়াহবিয়্যাহ, মিসর - ১২৮৩ হি.
(এবং এটি দার সাদির - বৈরুতের ন্যায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক পুনর্মুদ্রিত হয়েছে)
খণ্ড সংখ্যা: ২
[গ্রন্থের সংখ্যায়ন মুদ্রিত কপির অনুরূপ]
শামেলা-তে প্রকাশের তারিখ: ৮ জিলহজ ১৪৩১
এবং নববীর আল-ইযাহ এবং তাঁর আল-মিনহাজ, আল-আযকার এবং রিয়াযুস সালিহীন; এবং আন-নাজমুল ওয়াহহাজ; এবং তাবারানির আল-মু'জাম; এবং মুহিব্ব তাবারির যাখাইরুল উকবা, আস-সিমতুস সামীন, খুলাসাতুস সিয়ার এবং আর-রিয়াযুন নাযিরাহ; এবং আল-মুত্তাকি; এবং শাওয়াছিদুন নুবুওয়াহ; এবং আহমাদ কাসতাল্লানির আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়াহ; এবং রওযাতুল আহবাব; এবং আসমাউর রিজাল; এবং মুযীলুল খুলাফা; এবং ইবনে হিশামের আস-সিরাহ; এবং আল-কালা'য়ির আল-ইকতিফা; এবং ইবনে আবদিল বার-এর আল-ইসতিয়াব; এবং আল-ইয়ামুরীর সীরাত; এবং আদ-দামইয়াতীর সীরাত; এবং মাগলতায়ীর সীরাত; এবং আল-কিরমানীর আল-মানাসিক; এবং রাফিয়ীর আত-তাযনীীব; এবং ইবনুল কায়্যিমের আল-হুদাই; এবং আবু লাইস সমরকান্দীর আত-তানবীহ; এবং ফাসলুল খিতাব; এবং আল-ফুতুহাতুল মাক্কিয়্যাহ; এবং রাবিউল আবরার; এবং হায়াতুল হাইওয়ান; এবং তালখিসুল মাগাযী; এবং যাইনুল কাসাস; এবং আল-আসকারির আমসাল; এবং সোহরাওয়ার্দীর কিতাবুল আলাম; এবং আজরাকির তারিখু মক্কাহ; এবং ইয়াফিঈর তারিখ; এবং ফাসীর শিফাউল গারাম; এবং যাহাবীর দুওয়ালুল ইসলাম; এবং শরীফ জুরজানির শারহুল মাওয়াকিফ; এবং তাফতাযানীর শারহুল মাকাসিদ; এবং দাওয়ানির শারহুল আকাইদ আল-আযুদিয়্যাহ এবং তাঁর সূরা কাফিরুনের তাফসীর ও আনমুযাজুল উলূম; এবং ফায়রূযাবাদীর আকাইদ; এবং ফুসূসুল হিকাম; এবং আল-উরওয়াতুল উসকা; এবং শিরআতুল ইসলাম; এবং মুহাম্মাদ শাহরাস্তানির আল-মিলাল ওয়ান নিহাল; এবং আল-হিদায়াহ, আল-মুতমারাআত, কানযুল ইবাদ, আল-মুহিম্মাত, তাশওয়িকুল মাসাজিদ, আল-মুক্তাসারুল জামি; এবং জওহরীর আস-সিহাহ; এবং আল-কামূস; এবং সামিউল আসামী; এবং মাওয়িরুদুল লাতাফাহ; এবং সাখাভীর আল-আসলুল আসীল; এবং আল-ফাওয়াইদ, আল-উনসুল জালীল, বাহজাতুল আনওয়ার, আল-আওয়ারিফ; এবং বাকরির মু'জামু মা ইসতা'জাম; এবং সুয়ূতির আনমুযাজুল লাবীব, আল-কাশফ এবং আদ-দারাজাতুল মুনীফাহ; এবং সা'লাবীর আল-আরাইস; এবং সাহহুস সাহাবাহ; এবং উসূলুস সাফফার; এবং আল-বাহরুল আমীক; এবং সিররুল আদব এবং আল-ইনসানুল কামিল।
* (এবং আমি এর নামকরণ করেছি) * আল-খামিস ফী আহওয়ালি আনফাসি নাফীস (অত্যন্ত দামী সত্তার অবস্থা বর্ণনায় বৃহস্পতিবারের ইতিহাস) * এবং আমি একে একটি ভূমিকা, তিনটি মূল স্তম্ভ এবং একটি উপসংহারে বিন্যস্ত করেছি। *(ভূমিকা প্রসঙ্গে) এটি হচ্ছে তাঁর নূরের সৃষ্টির শুরু থেকে তাঁর জন্ম ও আত্মপ্রকাশের সময় পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনাবলী সম্পর্কে এবং এটি তিনটি প্রারম্ভিক পর্বে (তালীআহ) বিভক্ত।
(প্রথম প্রারম্ভিক পর্ব) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, রাসূল, উলুল আযম এবং সর্বশেষ নবী (খাতাম)-এর সংজ্ঞায় এবং তাঁদের ও সাধারণ মানুষ ও ফেরেশতাদের মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে; এবং নবী ও ওলী এবং জাদুকরের মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে। এছাড়া আল্লাহ প্রথম যা সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর দেহগত অস্তিত্বের পূর্বে তাঁর নূর থেকে যা শুরু হয়েছে, এবং আদম আলাইহিস সালাম-এর মাটি সৃষ্টির পূর্বে তাঁর পবিত্র মাটি সৃষ্টি প্রসঙ্গে। আরও রয়েছে নবীদের অবয়ব সংক্রান্ত হাদীস এবং প্রাচীন আসমানী কিতাবসমূহ, পূর্ববর্তী আলেমগণ, জিন ও গণকদের সংবাদের মাধ্যমে তাঁর নবুওয়াতের প্রমাণ ও রিসালাতের নিদর্শনাদির আলোচনা।
(দ্বিতীয় প্রারম্ভিক পর্ব) আসমান ও জমিন সৃষ্টি এবং তা সৃষ্টির সময়কাল, ফেরেশতা ও জিন সৃষ্টি, পৃথিবীর স্থায়িত্বকাল, এই উম্মতের স্থায়িত্বকাল, আদম ও হাওয়ার সৃষ্টির সূচনা, রূহ (আত্মা) বিষয়ক আলোচনা, ঈসা, মারইয়াম ও ইয়াহইয়া আলাইহিমুস সালাম সংক্রান্ত আলোচনা, অঙ্গীকার (মীসাক) গ্রহণ এবং কীভাবে তা পবিত্র পৃষ্ঠদেশ থেকে পবিত্র গর্ভে এবং এর বিপরীতে স্থানান্তরিত হয়েছে তার বর্ণনা। তাঁর উভয় পক্ষের বংশলতিকার বর্ণনা, ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম-এর জন্ম ও তাঁকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপের ঘটনা, শাম ও পবিত্র ভূমির বর্ণনা, কাবার আদি ইতিহাস, এর নির্মাণ সংখ্যা এবং যারা এর নির্মাণ কাজ পরিচালনা করেছেন। এতে আরও রয়েছে যুল-কারনাইন, ইয়াজূজ-মাজূজ, দাজ্জাল, খিজির ও জমিনের প্রাণী সংক্রান্ত আলোচনা। এছাড়া ইসমাইল আলাইহিস সালাম-এর যুগে যমযম কূপের প্রকাশ, এরপর তা বিলুপ্ত হওয়া এবং আবদুল মুত্তালিবের যুগ পর্যন্ত তা বিলুপ্ত থাকার বর্ণনা। এতে ইয়াকুব ও ইউসুফ আলাইহিমুস সালাম-এর আলোচনা, শাইয়া আলাইহিস সালাম-এর হত্যাকাণ্ড, বুখতে নাসর কর্তৃক বায়তুল মুকাদ্দাস ধ্বংস, যাকারিয়া ও ইয়াহইয়া আলাইহিমুস সালাম-এর হত্যাকাণ্ডের কাহিনী এবং আবদুল মুত্তালিবের যুগে দ্বিতীয়বার যমযম কূপের প্রকাশের বর্ণনা রয়েছে।
(তৃতীয় প্রারম্ভিক পর্ব) আবদুল্লাহর জন্ম, আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক তাঁকে যবেহ করার মানত এবং আবদুল্লাহকে যবেহ করার জন্য পেশ করা, আমিনার সাথে তাঁর বিবাহ, খাসআমিয়ার ঘটনা, গর্ভকালীন সময়ের ঘটনাবলী, আবদুল্লাহর ইন্তেকাল এবং হস্তীবাহিনীর (আসহাবে ফীল) কাহিনী।
(আর তিনটি মূল স্তম্ভের মধ্যে প্রথম স্তম্ভটি হলো) তাঁর জন্মের বছর থেকে তাঁর নবুওয়াত প্রাপ্তির সময় পর্যন্ত ঘটনাবলী সম্পর্কে এবং এতে তিনটি পরিচ্ছেদ রয়েছে।
(প্রথম পরিচ্ছেদ) তাঁর জন্মের বছর থেকে তাঁর জন্মের ইতিহাস অনুযায়ী একাদশ বছর পর্যন্ত ঘটনাবলী এবং জন্মের সময় যা কিছু ঘটেছিল তার বর্ণনা। এতে আরও রয়েছে তাঁর খতনা, তাঁর নামসমূহ, উপাধি ও ডাকনামসমূহ, তাঁর অবয়ব, গুণাবলী, বৈশিষ্ট্য ও মোজেজাসমূহ, ধাত্রীদের দ্বারা স্তন্যপান করানো ও তাঁদের সংখ্যা, হালিমার কাছে থাকাকালীন বক্ষ বিদীর্ণ হওয়া ও অন্যান্য ঘটনা, আবু বকর সিদ্দিকের জন্ম, হালিমা কর্তৃক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসার সময় পথিমধ্যে হারিয়ে ফেলা, তাঁর মায়ের ইন্তেকাল, উসমান ইবনে আফফানের জন্ম, আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক তাঁর লালন-পালন, তাঁর চোখের অসুখ ও আবদুল মুত্তালিবের বৃষ্টির জন্য দোয়া প্রার্থনা, সাইফ বিন যী-ইয়াযানের হাদীস, সুলায়মান ও বিলকিসের আলোচনা, আবদুল মুত্তালিবের ইন্তেকাল, আবু তালিব কর্তৃক লালন-পালন, হাতিম তাঈ-এর মৃত্যু, কিসরা আনুশিরওয়ানের মৃত্যু এবং তাঁর পুত্র হরমুযের শাসনভার গ্রহণ।
(দ্বিতীয় অধ্যায়) তাঁর জন্মের দ্বাদশ বর্ষ থেকে চব্বিশতম বর্ষ পর্যন্ত ঘটনাবলি: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আবু তালিবের সিরিয়া সফর এবং তাঁর মেষ চড়ানোর আলোচনা এবং উমর ইবনুল খাত্তাবের জন্ম ও দ্বিতীয় ফিজার যুদ্ধ এবং ইয়ামেন সফরের ব্যাপারে যুবাইর ইবনুল মুত্তালিব অথবা আব্বাসের সংকল্প এবং হরমযকে ক্ষমতাচ্যুত করা ও তাকে হত্যা এবং কিসরা পারভেজের ক্ষমতা লাভ এবং কারো কারো মতে দ্বিতীয় ফিজার যুদ্ধ এবং আবু বকরের সাথে সিরিয়ার বাণিজ্য এবং হিলফুল ফুজুল এবং কয়েক রাত যাবত জনৈক আগন্তুকের আসা নিয়ে তাঁর চাচার কাছে অভিযোগ এবং কাবা গৃহ ধ্বংস ও কিছু আলেমের মতে এর পুনর্নির্মাণ।
(তৃতীয় অধ্যায়) তাঁর জন্মের পঁচিশতম বর্ষ থেকে চল্লিশতম বর্ষ পর্যন্ত ঘটনাবলি: খাদিজার গোলাম মায়সারাহ-এর সাথে সিরিয়া গমন এবং নাসতূরা রাহিবের (খ্রিস্টান সন্ন্যাসী) ঘটনা এবং খাদিজার সাথে বিবাহ ও তাঁর ওয়ালিমা এবং সংক্ষেপে তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদের আলোচনা এবং তাঁর দাসী ও সন্তানদের আলোচনা এবং তাঁর কন্যাদের বিবাহ ও জামাতাদের বর্ণনা এবং আলী ইবনে আবি তালিবের জন্ম এবং কাবা গৃহ ধ্বংস ও নির্মাণ এবং ফাতিমার জন্ম এবং যায়দ ইবনে আমর ইবনে নুফাইলের মৃত্যু এবং তাঁর নূর ও আলো দর্শন এবং কিসরা পারভেজ কর্তৃক নুমান ইবনুল মুনযিরের হত্যাকাণ্ড।
(দ্বিতীয় স্তম্ভ) তাঁর নবুয়ত প্রাপ্তির শুরু থেকে হিজরত পর্যন্ত ঘটনাবলি: ওহী নাযিল হওয়ার বর্ণনা এবং শয়তানদের উল্কাপিণ্ড নিক্ষেপ এবং কিসরার প্রাসাদের চূড়া ভেঙে পড়া এবং সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারীগণ এবং দাওয়াত গোপন রাখা এবং ওয়ারাকা ইবনে নাওফলের ইন্তেকাল এবং প্রকাশ্যে দাওয়াত এবং আয়েশার জন্ম এবং আবিসিনিয়ায় হিজরত এবং মুশরিকদের নির্যাতন এবং সুমাইয়া বিনতে খুব্বাতের শাহাদাত এবং হামযা ও উমর ইবনুল খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ এবং বুয়াস যুদ্ধ এবং বনী হাশিম ও বনী মুত্তালিবের বিরুদ্ধে কুরাইশদের শত্রুতার চুক্তি এবং সূরা আর-রূম নাযিল হওয়া এবং চন্দ্র দ্বিধাবিভক্ত হওয়া এবং আবু তালিব ও খাদিজার মৃত্যু এবং সাকীফ গোত্রের বর্ণনা এবং জীনদের প্রতিনিধি দল এবং সওদা ও আয়েশার সাথে বিবাহ এবং আনসারদের ইসলাম গ্রহণ শুরু এবং মেরাজের বর্ণনা এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরয হওয়া এবং প্রথম বাইয়াতে আকাবা ও দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবা এবং আবু বকরের আবিসিনিয়ায় হিজরত এবং সাহাবায়ে কেরামের মদিনায় হিজরত শুরু এবং তাঁকে বন্দি করা, হত্যা করা অথবা দেশান্তর করা নিয়ে কুরাইশদের শলাপরামর্শ এবং জিবরাঈল কর্তৃক তাঁকে এ সংবাদ প্রদান এবং তাঁকে হিজরতের অনুমতি দান।
(তৃতীয় স্তম্ভ) তাঁর নবুয়তের শুরু থেকে হিজরত ও তাঁর ইন্তেকাল পর্যন্ত ঘটনাবলি, এতে এগারোটি পর্যায় রয়েছে। (প্রথম পর্যায়) হিজরতের প্রথম বর্ষের ঘটনাবলি, এতে দুটি পরিচ্ছেদ রয়েছে। (প্রথম পরিচ্ছেদ) আবু বকরের সাথে তাঁর মক্কা থেকে গুহায় গমন এবং সেখানে তাঁদের তিন দিন অবস্থান এবং গুহা থেকে বের হওয়া ও মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা এবং পথে সুরাকা কর্তৃক তাঁদের পাকড়াও করার উপক্রম হওয়া এবং উম্মে মা’বাদের তাঁবুদ্বয়ের পাশ দিয়ে অতিবাহিত হওয়া এবং তাঁদের সাথে বুরাইদাহ ইবনুল হুসাইবের সাক্ষাৎ এবং পথে তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ ও যুবাইর ইবনুল আওয়ামের সাথে তাঁদের সাক্ষাৎ এবং বারা ইবনে মা’রূরের মৃত্যু এবং মদিনাবাসীদের অভ্যর্থনা এবং কুবা পল্লীতে তাঁদের অবতরণ এবং বনী আমর ইবনে আউফ গোত্রে তাঁদের অবস্থান এবং কুবা মসজিদ প্রতিষ্ঠা।
(দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ) কুবা থেকে মদিনার অভ্যন্তরে স্থানান্তর এবং মদিনার অভ্যন্তরে প্রবেশের পূর্বে ইসলামে প্রথম জুমুআর সালাত আদায় এবং আবু আইয়ুবের ঘরে তাঁর অবতরণ ও তাঁর বাড়িতে অবস্থান এবং মসজিদ নির্মাণ এবং কুলসুম ইবনে হাদমের মৃত্যু এবং আবদুল্লাহ ইবনে সালামের ইসলাম গ্রহণ এবং আসআদ ইবনে যুরারার মৃত্যু এবং আনাসের খেদমত শুরু এবং মুকিম অবস্থায় নামাজের রাকাত বৃদ্ধি এবং আবু বকর ও সাহাবায়ে কেরামের জ্বর এবং সালমানের ইসলাম গ্রহণ এবং মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন এবং ইহুদিদের সাথে সন্ধি এবং মক্কার মুশরিকদের মধ্য থেকে আস ইবনে ওয়াইলের মৃত্যু এবং নিজের পরিবারকে আনতে যায়দ ইবনে হারিসাকে মক্কায় প্রেরণ এবং নুমান ইবনে বশীরের জন্ম ও আবদুল্লাহ ইবনুল যুবাইরের জন্ম এবং ফাতিমা বিনতে নুমানের আলোচনা এবং নেকড়ে বাঘের কথা বলা এবং যুদ্ধের সূচনা এবং হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিবকে সায়ফুল বাহর অভিযানে প্রেরণ এবং ওবায়দা ইবনুল হারিসের অভিযান রাবিগ উপত্যকায় এবং আয়েশার সাথে ঘরসংসার শুরু এবং সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে আল-খারে প্রেরণ এবং আযানের সূচনা।
(দ্বিতীয় পর্যায়) হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষের ঘটনাবলি: আশুরার রোজা, ফাতিমার সাথে আলীর বিবাহ, আবওয়া ও ওয়াদ্দান যুদ্ধ, বুওয়াত যুদ্ধ, উশাইরা যুদ্ধ, আলীকে 'আবু তুরাব' উপনাম প্রদান, প্রথম বদর যুদ্ধ, আবদুল্লাহ ইবনে জাহশের অভিযান, কিবলা পরিবর্তন, কুবা মসজিদ সংস্কার, রমজানের রোজা ফরয হওয়া, বদরে কুবরা (বড় বদর যুদ্ধ), পারসিকদের ওপর রোমানদের বিজয়, রুকাইয়ার মৃত্যু, উমায়ের ইবনে আদী কর্তৃক আসমাকে হত্যা, ঈদুল ফিতরের নামাজ ও সদকাতুল ফিতর, সম্পদের যাকাত ফরয হওয়া, কারকারাতুল কুদর যুদ্ধ, সালেম ইবনে উমায়েরের অভিযান, বনী কাইনুকা যুদ্ধ, সাভিক যুদ্ধ এবং উসমানের মৃত্যু।
আস-সানি এবং জাতুল হালাহে কাব বিন উমাইর আল-গিফারীর অভিযান, জাতুস সালাসিলে আমর ইবনুল আসের অভিযান, সায়ফুল বাহর অভিমুখে আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ-এর অভিযান, খাদরা অভিমুখে আবু কাতাদার অভিযান, বাতনে ইদামে আবু কাতাদার অভিযান, আল-গাবাহ অভিমুখে আবদুল্লাহ বিন আবি হাদরাদের অভিযান, মক্কা বিজয়ের যুদ্ধ, আবু সুফিয়ান বিন হারবের ইসলাম গ্রহণ, আবু কুহাফার ইসলাম গ্রহণ, হাকিম বিন হিজামের ইসলাম গ্রহণ, ইকরিমা বিন আবি জাহলের ইসলাম গ্রহণ, মক্কা বিজয়ের পর নাখলায় উযযা মূর্তির অভিমুখে খালিদ বিন ওয়ালিদের অভিযান, হুযাইল গোত্রের সুওয়া মূর্তির অভিমুখে আমর ইবনুল আসের অভিযান, আউস গোত্রের মানাত মূর্তির অভিমুখে সাদ বিন যায়েদ আল-আশহালীর অভিযান, বনু খুযাইমা অভিমুখে খালিদ বিন ওয়ালিদের অভিযান, হুনাইনের যুদ্ধ, আওতাস অভিমুখে আবু আমিরের অভিযান, যুল কাফফাইন অভিমুখে তুফাইল ইবনে আমর আদ-দাওসীর অভিযান, তায়েফ যুদ্ধ, সাফওয়ান বিন উমাইয়ার ইসলাম গ্রহণ, মালিক বিন আউফ আন-নাদরীর ইসলাম গ্রহণ, ওমানে আমর ইবনুল আসকে প্রেরণ, বাহরাইনে আলা আল-হাদরামীকে প্রেরণ, উরওয়াহ বিন মাসউদ আস-সাকাফীর ইসলাম গ্রহণ, ইয়ামেন অভিমুখে কাইস বিন সাদ বিন উবাদাহকে প্রেরণ, মালীকা আস-সাকান্দারিয়্যাহকে বিবাহ, সাওদাহ (রা.)-কে তালাক প্রদান, ইব্রাহিমের জন্ম, প্রতিনিধি দলসমূহের আগমন শুরু এবং যয়নাব (রা.)-এর ইন্তেকাল। (নবম পরিচ্ছেদ) হিজরী নবম বর্ষের ঘটনাবলী: বনু তামিমে উয়াইনাহ বিন হিসন আল-ফাজারীকে প্রেরণ, বনু মুস্তালিকে ওয়ালিদ বিন উকবাহ বিন আবি মুআইতকে প্রেরণ, খাশআম অভিমুখে কুতবাহ বিন আমিরের অভিযান, বনু কিলাবে দাহহাককে প্রেরণ, হাবশায় আলক্বামাহর অভিযান, তায় গোত্রের ফুলস মূর্তির অভিমুখে আলী বিন আবি তালিবকে প্রেরণ, আল-হুবাব অভিমুখে উকাশাহর অভিযান, কাব বিন যুহাইরের ইসলাম গ্রহণ, একের পর এক প্রতিনিধি দলের আগমন, ঈলা-এর ঘটনা, তাবুক যুদ্ধ, উকাইদির অভিমুখে খালিদ বিন ওয়ালিদের অভিযান, হিরাক্লিয়াসের নিকট তাঁর পত্র প্রেরণ, আবদুল্লাহ যুল বিজিদাইনের মৃত্যু, মসজিদে দিরার ধ্বংসকরণ, কাব বিন মালিক ও তাঁর দুই সঙ্গীর ঘটনা এবং তাঁদের বিষয় বিলম্বিত হওয়া, লিআনের ঘটনা, সাকিফ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ, হিমইয়ারের রাজাদের পত্রের আগমন, গামিদিয়া মহিলার রজম, নাজাশীর ইন্তেকাল, উম্মু কুলসুমের ইন্তেকাল, আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সুলুলের মৃত্যু, আবু বকরের হজ্ব সম্পাদন, পারস্য সম্রাট শাহরিয়ার বিন শিরওয়াইহকে হত্যা এবং কিসরার কন্যা তুরানকে তাদের সিংহাসনে আসীন করা। (দশম পরিচ্ছেদ) হিজরী দশম বর্ষের ঘটনাবলী: আদি বিন হাতিমের আগমন, ইয়ামেনে আবু মুসা ও মুয়ায বিন জাবালকে প্রেরণ, নাজরানের বনু হারিস অভিমুখে খালিদ বিন ওয়ালিদকে প্রেরণ, ইয়ামেনে আলী বিন আবি তালিবকে প্রেরণ, যুল খালাসাহ ধ্বংস করার জন্য জারির বিন আবদুল্লাহ আল-বাজালীকে প্রেরণ, যুল কালা অভিমুখে জারিরকে প্রেরণ, নাজরানে আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহকে প্রেরণ, বুদাইল ও তামীম আদ-দারীর কাহিনী, ইব্রাহিমের ইন্তেকাল এবং ইব্রাহিমের ইন্তেকালের দিনে সূর্যগ্রহণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে জিবরাঈলের উপস্থিতি, ফিরোজ আদ-দাইলামীর আগমন, ফারওয়া বিন আমর আল-জুযামির ইসলাম গ্রহণ, বিদায় হজ্ব, বিদায় হজ্বে একটি শিশুর আগমন, বাযানের মৃত্যু, অনুমতি প্রার্থনা সংক্রান্ত আয়াতের অবতরণ এবং রাহিব আবু আমিরের মৃত্যু। (একাদশ পরিচ্ছেদ) হিজরী একাদশ বর্ষের ঘটনাবলী: নাখ্খ প্রতিনিধি দলের আগমন, বাকী গোরস্তানের অধিবাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা, নবি অভিমুখে উসামা বিন যায়েদের অভিযান, আসওয়াদ আনসী, ভণ্ড নবী মুসাইলামাহ, সাজাহ ও তুলাইহার বর্ণনা, তাঁর অসুস্থতার পূর্বে যা ঘটেছে এবং অসুস্থ কালীন ঘটনাবলী, তাঁর অসুস্থতার সময়কাল, তাঁর বয়স এবং ইন্তেকালের সময়কাল, আবু বকরের বাইয়াত গ্রহণ, তাঁকে গোসল করানো, কাফন পরানো, তাঁর জানাযা, কবর এবং দাফন, তাঁর জন্য শোক প্রকাশ, তাঁর উত্তরাধিকার, তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তি এবং এই বিষয়ে তাঁর হুকুম, স্বপ্নে তাঁকে দেখা এবং সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা মুবারক ও মদীনার অন্যান্য যিয়ারতের স্থানসমূহের আলোচনা। (উপসংহার) এতে দুইটি পরিচ্ছেদ রয়েছে: (প্রথম পরিচ্ছেদ) বিবিধ বিষয়: তাঁর ক্রীতদাস, দেহরক্ষী ও খাদেমগণ এবং তাঁর সামনে যাদের শিরশ্ছেদ করা হতো তাঁদের বর্ণনা; তাঁর আযাদকৃত দাস, প্রশাসক, বার্তাবাহক, লেখক, মুয়াজ্জিন, খতীব, কবি ও উট চালকদের আলোচনা; তাঁর ঘোড়া, উট, চতুষ্পদ জন্তু, যুদ্ধাস্ত্র ও পোশাক এবং তাঁর নিকট আগত প্রতিনিধি দলের বর্ণনা। (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ) খুলাফায়ে রাশিদীন, উমাইয়া খলিফা এবং আব্বাসীয় খলিফাদের বর্ণনা।
নবী ও রাসূলের সংজ্ঞায় প্রথম উপক্রমণিকা* (ভূমিকা থেকে প্রাপ্ত প্রথম উপক্রমণিকা: নবী, রাসূল, উলুল আযম ও খাতাম-এর সংজ্ঞা; তাঁদের সাথে সাধারণ মানুষ ও ফেরেশতাদের পার্থক্য; নবী, ওলী ও জাদুকরের মধ্যকার পার্থক্য; মহান আল্লাহ যা প্রথম সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর বাহ্যিক অস্তিত্বের পূর্বে তাঁর নূরসমূহের সূচনা; আদম (আ.)-এর মাটি সৃষ্টির পূর্বে তাঁর মাটি সৃষ্টি; নবীদের অবয়বের বর্ণনা এবং প্রাচীন কিতাবসমূহ, পূর্ববর্তী আলেমগণ এবং জিন ও গণকদের সংবাদের মাধ্যমে তাঁর নবুওয়াত ও রিসালাতের প্রমাণসমূহ ও আলামতসমূহের আলোচনা।) *আল-কাশশাফ-এর বর্ণনা অনুযায়ী তেরো তারিখে ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর ওপর ইনজিল নাজিল হয়েছিল। মতান্তরে জাবুর অবতীর্ণ হওয়ার বারোশত বছর পর রমজান মাসের আঠারো রাত অতিবাহিত হওয়ার পর তা নাজিল হয়। আর মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর ফুরকান (কুরআন) অবতীর্ণ হয়েছে ইনজিলের ছয়শত বিশ বছর পর, রমজান মাসের চব্বিশ অথবা সাতাশ রাত অতিবাহিত হওয়ার পর। এর অবতরণ পদ্ধতির বিষয়ে তিনটি মত রয়েছে। প্রথমটি হলো: এটি লাইলাতুল কদরে লাওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আসমানে একবারে অবতীর্ণ হয়েছে এবং জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) তা লেখক ফেরেশতাদের সামনে পাঠ করেছেন। অতঃপর নবুওয়াতের পর মক্কায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর অবস্থানের মেয়াদের ভিন্নতা অনুযায়ী বিশ, তেইশ অথবা পঁচিশ বছর ধরে পর্যায়ক্রমে তা তাঁর ওপর নাজিল হতে থাকে। মক্কায় তাঁর অবস্থানের মেয়াদ সম্পর্কে দশ, তেরো এবং পনেরো বছরের উক্তি রয়েছে; তবে মদিনায় অবস্থানের মেয়াদ যে দশ বছর ছিল সে বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই। তাঁরা লাইলাতুল কদরের সময় নিয়ে মতভেদ করেছেন, তবে অধিকাংশের মতে তা রমজান মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাতে। আর অধিকাংশ বর্ণনা অনুযায়ী তা সাতাশতম রাতে, যেমনটি আল-কাশশাফ-এ বর্ণিত হয়েছে। এটিই প্রথম মত এবং এটিই অধিকতর প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ, যার ওপর অধিকাংশ আলিম একমত। ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে হাকেম তাঁর মুস্তাদরাক-এ যা বর্ণনা করেছেন তা এই মতটিকে সমর্থন করে। তিনি বলেন, 'কুরআন লাইলাতুল কদরে একবারে দুনিয়ার আসমানে নাজিল হয়েছে, অতঃপর তা বিশ বছর ধরে অবতীর্ণ হয়েছে।' হাকেম বলেন, এটি শায়খাইন (বুখারি ও মুসলিম)-এর শর্ত অনুযায়ী বিশুদ্ধ। নাসায়ী তাঁর তাফসিরে হাসসান বিন আবি আল-আশরাস এর মাধ্যমে সাঈদ বিন জুবায়ের ও ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: 'যিকির অর্থাৎ উম্মুল কিতাব তথা লাওহে মাহফুজ থেকে কুরআনকে পৃথক করে দুনিয়ার আসমানের বাইতুল ইজ্জাতে একবারে নাজিল করা হয়েছে।' এর সনদ বিশুদ্ধ এবং হাসসান বিন আবি আল-আশরাসকে নাসায়ী ও অন্যান্যরা নির্ভরযোগ্য বলেছেন। দ্বিতীয় মতটি হলো, বিশ বছরের বিশটি লাইলাতুল কদরে তা দুনিয়ার আসমানে নাজিল হয়েছে। মতান্তরে তেইশ বছরের তেইশটি লাইলাতুল কদরে অথবা পঁচিশ বছরের পঁচিশটি লাইলাতুল কদরে। প্রতি বছরের লাইলাতুল কদরে সেই বছরের জন্য নির্ধারিত অংশটুকু নাজিল হতো, অতঃপর সারা বছর ধরে তা আমাদের নেতা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হতো। কোনো কোনো আলেমের বক্তব্যের অর্থও এটিই যে, প্রতি বছরের লাইলাতুল কদরে পরবর্তী বছর পর্যন্ত যা প্রয়োজন তা নাজিল হতো। জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) লাইলাতুল কদরে সপ্তম আসমান থেকে দুনিয়ার আসমানের বাইতুল ইজ্জাতে নেমে আসতেন, অতঃপর সেখান থেকে প্রয়োজন ও ঘটনার প্রেক্ষিতে পরবর্তী লাইলাতুল কদর পর্যন্ত তা নাজিল করতেন। যখন পরবর্তী লাইলাতুল কদর আসত, তখন পূর্ববর্তী লাইলাতুল কদরের মতো করেই নাজিল করা হতো। মুকাতিল, ইমাম আবু আব্দুল্লাহ আল-হালিমি তাঁর আল-মিনহাজ গ্রন্থে এবং মাওয়ার্দি তাঁর তাফসিরে এই দ্বিতীয় মতটি ব্যক্ত করেছেন। তৃতীয় মতটি হলো, লাইলাতুল কদরে এর অবতরণ শুরু হয়েছে, এরপর বিভিন্ন সময়ে পর্যায়ক্রমে তা নাজিল হয়েছে। ইমাম শাবী ও অন্যান্যরা এই মতটি দিয়েছেন। জেনে রাখুন যে, আহলে সুন্নাত এ বিষয়ে একমত যে আল্লাহর কালাম নাজিলকৃত। তবে নাজিল হওয়ার অর্থের বিষয়ে তাঁরা মতভেদ করেছেন। কেউ বলেছেন এর অর্থ কুরআনের প্রকাশ ঘটানো। আবার কেউ বলেছেন আল্লাহ তাঁর কালাম জিবরাঈলকে আসমানে থাকাকালীন বুঝিয়ে দিয়েছিলেন—এমতাবস্থায় যে আল্লাহ স্থানের ঊর্ধ্বে সুমহান—এবং তাঁকে এর তিলাওয়াত শিক্ষা দিয়েছিলেন। অতঃপর জিবরাঈল দুনিয়ায় অবতরণ করে তা পৌঁছে দেন। নিশাপুরি তাঁর তাফসিরে উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহ লাইলাতুল কদরের এক রাতে জিবরাঈলের সাথে কুরআনের মাধ্যমে কথা বলেছিলেন। জিবরাঈল তা শুনে অন্তরে মুখস্থ করে নেন এবং দুনিয়ার আসমানের লেখকদের কাছে নিয়ে আসেন, তারা তা লিপিবদ্ধ করে। অতঃপর বিভিন্ন সময়ে অর্থাৎ নির্দিষ্ট মেয়াদে তা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর নাজিল হয়। যারকাশি আল-বুরহান গ্রন্থে বলেছেন, ওহি অবতরণের দুটি পদ্ধতি রয়েছে। প্রথমটি হলো, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মানবীয় রূপ থেকে ফেরেশতাসুলভ রূপে রূপান্তরিত হতেন এবং জিবরাঈলের কাছ থেকে তা গ্রহণ করতেন। দ্বিতীয়টি হলো, ফেরেশতা মানব রূপ ধারণ করতেন যাতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর থেকে ওহি গ্রহণ করতে পারেন; এবং এই দুই অবস্থার মধ্যে প্রথমটিই ছিল অধিকতর কঠিন। কেউ কেউ সমরকান্দি থেকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর যা নাজিল হয়েছে সে বিষয়ে তিনটি মত বর্ণনা করেছেন। প্রথমটি হলো, এটি শব্দ এবং অর্থ উভয়ই; এবং জিবরাঈল লাওহে মাহফুজ থেকে তা মুখস্থ করে নিয়ে এসেছিলেন। কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন যে, লাওহে মাহফুজে কুরআনের প্রতিটি অক্ষর কাফ পাহাড়ের সমান এবং প্রতিটি অক্ষরের নিচে এমন গূঢ় অর্থ নিহিত রয়েছে যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। ইমাম গাজালির বক্তব্যের মর্মার্থও এটিই যে এই অক্ষরগুলো অর্থের জন্য আবরণস্বরূপ। দ্বিতীয় মতটি হলো, জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) কেবল অর্থ নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেই অর্থগুলো অনুধাবন করে তা আরবি ভাষায় ব্যক্ত করেছেন; তারা আল্লাহর এই বাণীকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেন: 'আপনার হৃদয়ে বিশ্বাসযোগ্য আত্মা এটি নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন।' আর তৃতীয় মতটি হলো
জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) তাঁর ওপর কেবল অর্থ নিক্ষেপ করেছিলেন এবং তিনি এই শব্দগুলোর মাধ্যমে তা ব্যক্ত করেছিলেন।
আল-উসাব শব্দটি আইন ও সিন উভয় বর্ণে পেশ এবং এরপর বা বর্ণ সহযোগে গঠিত, যা আসিব-এর বহুবচন। এগুলো হলো খেজুরের ডাল; তারা এর পাতা ছাড়িয়ে নিতেন এবং প্রশস্ত প্রান্তে লিখতেন। বলা হয়েছে যে, আল-উসাব হলো খেজুর ডালের সেই প্রশস্ত অংশ যেখানে পাতা গজায় না, আর যে অংশে পাতা গজায় তাকে আস-সাআফ বলা হয়। আর-রিকা হলো রুকআ-এর বহুবচন, যা চামড়া, পাতলা চামড়া অথবা কাগজের টুকরো হতে পারে। এক রেওয়ায়েতে আদিম (পাকা চামড়া) এর টুকরো কথাটি এসেছে। আল-লিখাফ শব্দটি লাম বর্ণের নিচে যের এবং এরপর হালকা খা ও শেষে ফা বর্ণ সহযোগে গঠিত, যা লাখফাহ-এর বহুবচন (লাম বর্ণে জবর ও খা বর্ণে সাকিন যোগে)। অন্য রেওয়ায়েতে আল-লুখুফ শব্দটি দুই পেশ ও শেষে ফা বর্ণ যোগে এসেছে। আবু দাউদ বলেন, এগুলো হলো পাতলা পাথর। খাত্তাবী বলেন, এগুলো পাতলা পাথরের ফলক। আসমায়ী বলেন, এতে প্রশস্ততা ও পাতলাভাব রয়েছে। ইবনে হাজার এর ব্যাখ্যায় আল-খাজাফ (খা ও যা বর্ণে জবর যোগে) শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যা পোড়ামাটির তৈরি পাত্রকে বোঝায়। এক রেওয়ায়েতে যায়িদ (রা.) বলেন, আমরা যখন মুসহাফ নকল করছিলাম তখন সূরা আহযাবের একটি আয়াত হারিয়ে ফেলেছিলাম, যা আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তিলাওয়াত করতে শুনতাম। আমি খুযায়মা আনসারী ছাড়া আর কারো কাছে তা পাইনি; আয়াতটি হলো: 'মুশমিনদের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছে'। অতঃপর আমরা তা নির্দিষ্ট সূরার অন্তর্ভুক্ত করি। এই খুযায়মা-ই হলেন সেই ব্যক্তি যার সাক্ষ্য দুইজনের সাক্ষ্যের সমান (যুল শাহাদাতাইন)। ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, হুযায়ফা (রা.) উসমান (রা.)-এর নিকট আসলেন; তিনি তখন ইরাকবাসীদের সাথে নিয়ে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান বিজয়ের যুদ্ধে শামিল ছিলেন। কিরাআত নিয়ে তাদের মধ্যকার মতভেদ হুযায়ফাকে ভীত করে তুলল। তিনি উসমান (রা.)-কে বললেন, এই উম্মত ইয়াহুদী ও নাসারাদের মতো মতভেদে লিপ্ত হওয়ার আগেই তাদের রক্ষা করুন। তখন উসমান (রা.) হাফসা (রা.)-এর নিকট এই মর্মে বার্তা পাঠালেন যে, আমাদের নিকট মূল পাণ্ডুলিপিগুলো পাঠান যাতে আমরা সেগুলো মুসহাফসমূহে নকল করতে পারি, এরপর তা আপনার নিকট ফেরত পাঠিয়ে দেব। হাফসা (রা.) সেগুলো তাঁর নিকট পাঠালে তিনি যায়িদ বিন সাবিত, আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর, সাঈদ বিন আস এবং আব্দুর রহমান বিন হারিস বিন হিশামকে নির্দেশ দিলেন এবং তারা সেগুলো মুসহাফসমূহে নকল করলেন। উসমান (রা.) কুরাইশ বংশীয় তিন ব্যক্তিকে বললেন, যখন কোনো বিষয়ে যায়িদ বিন সাবিতের সাথে তোমাদের মতভেদ হবে, তখন তা কুরাইশদের ভাষায় লিখবে; কারণ কুরআন তাদের ভাষাতেই অবতীর্ণ হয়েছে। তারা তাই করলেন। যখন তারা পাণ্ডুলিপিগুলো মুসহাফসমূহে নকল সম্পন্ন করলেন, তখন উসমান (রা.) মূল পাণ্ডুলিপি হাফসা (রা.)-এর নিকট ফেরত দিলেন এবং নকলকৃত মুসহাফগুলোর একেকটি একেক অঞ্চলে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি নির্দেশ দিলেন যে, এগুলো ছাড়া অন্য যত ছোট-বড় পাণ্ডুলিপি বা মুসহাফ রয়েছে তা যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়। জেনে রাখা প্রয়োজন যে, এটি প্রসিদ্ধ যে উসমান (রা.) সর্বপ্রথম কুরআন সংগ্রহ করেছেন, কিন্তু বিষয়টি আসলে তেমন নয়। বরং আবু বকর সিদ্দীক (রা.) সর্বপ্রথম কুরআনকে একটি মুসহাফে একত্রিত করেছিলেন। অতঃপর উসমান (রা.) কিরাআতের ক্ষেত্রে মতভেদের আশঙ্কা দেখা দিলে সেই মূল সংগ্রহ থেকে একাধিক মুসহাফে তা রূপান্তরের নির্দেশ দেন। বায়হাকী এভাবেই বর্ণনা করেছেন এবং আল-বুরহান গ্রন্থেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে।
আল্লাহর কালাম যে ভাষাগুলোতে অবতীর্ণ হয়েছে তার বর্ণনাবলা হয় যে, আল্লাহর কালাম যে ভাষাগুলোতে অবতীর্ণ হয়েছে তা হলো আরবি, হিব্রু ও সিরিয়াক। কুরআন আরবি ভাষায়, তাওরাত হিব্রু ভাষায় এবং যাবুর ও ইঞ্জিল সিরিয়াক ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে—যেমনটি আল-ইনসানুল কামিল গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ ইঞ্জিল সিরিয়াক ভাষায় ছিল। সহীহ বুখারীতে ওরাকা বিন নওফলের কাহিনীতে এসেছে যে, তিনি জাহেলী যুগে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং হিব্রু কিতাব লিখতেন, অর্থাৎ তিনি ইঞ্জিল থেকে আরবিতে লিখতেন। এ থেকে বোঝা যায় যে ইঞ্জিল হিব্রু ভাষায় ছিল। অন্য রেওয়ায়েতে আছে যে, যাবুর হিব্রু ভাষায় ছিল এবং তা একশত পঞ্চাশটি সূরা সম্বলিত। সুতরাং আল্লাহর কালাম যখন আরবিতে প্রকাশ করা হয় তখন তাকে কুরআন বলা হয়, যখন হিব্রুতে প্রকাশ করা হয় তখন তাকে তাওরাত বলা হয় এবং যখন সিরিয়াক ভাষায় প্রকাশ করা হয় তখন তাকে যাবুর ও ইঞ্জিল বলা হয়। এই সব প্রকাশভঙ্গিই মহান আল্লাহর কালাম এবং এ নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। কারণ এগুলো থেকে তাই বোঝা যায় যা আল্লাহর সত্তাগত কালাম থেকে বোঝা যায় এবং এই প্রকাশভঙ্গিগুলো সেই সত্তাগত কালামেরই অর্থবহ রূপ। ওলামায়ে কেরাম একমত হয়েছেন যে, যা অন্তরে সংরক্ষিত, যা জিহ্বা দ্বারা পঠিত এবং যা মুসহাফে লিখিত তাকেই আল্লাহর কালাম বলা হয়। উলুল আযম রাসুলগণের পরিচয়আর রাসুলদের মধ্যে উলুল আযম তারা, যারা রিসালাত পৌঁছানোর পর কাফিরদের সাথে যুদ্ধ এবং পাপাচারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য আদিষ্ট ছিলেন। এটি সাধারণ নবুওয়াত ও রিসালাতের বিপরীত, কারণ জিহাদ সেগুলোর জন্য শর্ত নয়; যেমনটি আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়াতের প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। তখন কখনো তাঁর প্রতি ওহী আসত যে, 'আপনার দায়িত্ব কেবল পৌঁছে দেওয়া', আবার কখনো সম্বোধন করা হতো যে, 'বলুন, সত্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে, যার ইচ্ছা ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছা কুফরি করুক'। কিন্তু শেষ পর্যায়ে তিনি যুদ্ধ ও জিহাদের জন্য আদিষ্ট হন। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তোমরা মুশরিকদের সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধ করো', 'মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা করো' এবং 'তাদেরকে যেখানে পাও হত্যা করো'। আল-কাশশাফ গ্রন্থে আছে, উলুল আযম হলেন তারা যারা দৃঢ়তা, সংকল্প ও ধৈর্যের অধিকারী। বলা হয়েছে তারা হলেন নূহ, ইবরাহীম, ইয়াকুব, ইউসুফ, আইয়ুব, মুসা, দাউদ ও ঈসা আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম। আল-মাদারিক গ্রন্থে বলা হয়েছে, উলুল আযম বলতে সূরা আহযাবে যাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাদের বোঝানো হয়েছে: 'যখন আমি নবীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করলাম এবং আপনার কাছ থেকে, আর নূহ, ইবরাহীম, মুসা ও মারয়াম তনয় ঈসার কাছ থেকে'। উমদাতুল মাআনী গ্রন্থে আছে, উলুল আযম হলেন শরীয়তপ্রাপ্ত রাসুলগণ। বলা হয়েছে তারা হলেন নূহ, ইবরাহীম, মুসা ও ঈসা আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম। আবার বলা হয়েছে তারা আঠারো জন নবী, যাদের কথা সূরা আনআমের ধারাবাহিকভাবে তিন বা চারটি আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।লাওহে মাহফুজে রক্ষিত রয়েছে। এবং নূরসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম হলো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নূর। গবেষক আলেমগণের মতে, এই হাদিসগুলোর উদ্দেশ্য মূলত একটিই, তবে এর সম্পর্ক ও প্রেক্ষিত বিবেচনায় শব্দমালার ভিন্নতা এসেছে। যেমন কালো, তরল এবং উজ্জ্বল—এগুলো মূলত কালিরই বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, যা সম্পর্কের ভিন্নতার কারণে ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত হয়।
'শারহুল মাওয়াকিফ' গ্রন্থে কেউ কেউ বলেছেন যে, 'প্রথম মা'লুল' (সৃষ্ট বস্তু) যখন কেবল তার নিজ সত্তা ও উৎসের বুদ্ধিবৃত্তিক উপলব্ধির দিক থেকে বিবেচিত হয়, তখন তাকে 'আকল' (বুদ্ধি) বলা হয়। আবার যখন তা অন্যান্য বিদ্যমান বস্তুর উদ্ভব এবং জ্ঞানের নকশা তৈরির মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়, তখন তাকে 'কলম' বলা হয়। নবুওয়তের নূর বিচ্ছুরণের মাধ্যম হিসেবে এবং সাইয়্যিদুল আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নূরের প্রভাব থেকে অর্জিত মুহাম্মদী পূর্ণতা এবং তাঁর জীবনের কারণ হওয়ার দিক থেকে একে তাঁর 'রূহ' (আত্মা) বলা হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে।'শাওয়াহিদুল নবুওয়াত' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদিও দৃশ্যমান জগতে সর্বশেষ নবী, কিন্তু অদৃশ্য জগতে তিনি তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রথম। নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "আমি তখনও নবী ছিলাম যখন আদম পানি ও মাটির অন্তর্বর্তী অবস্থায় ছিলেন।" এর ব্যাখ্যা হলো, আল্লাহ তাআলা অনাদিকাল থেকে বিদ্যমান ছিলেন যখন তাঁর সাথে আর কিছুই ছিল না। তখন সমস্ত অবস্থা বা শান কোনো পার্থক্য ছাড়াই বিদ্যমান ছিল। সেই শান বা অবস্থার অবগতি বা জ্ঞানের রূপকে 'তাইয়্যুন-এ আউয়াল' (প্রথম আত্মপ্রকাশ) এবং 'হাকিকতে মুহাম্মদী' বলা হয়। আর অন্যান্য সমস্ত বিদ্যমান বস্তুর হাকিকত বা গূঢ়তত্ত্ব এর অংশ ও বিস্তারিত রূপ মাত্র। সুতরাং সেই হাকিকত এবং অদৃশ্য জগতে রূপায়িত তার জ্যোতি বা তাজাল্লি মূলত সেই হাকিকতের রূপের প্রতিফলন থেকেই উদ্ভূত হয়েছে। রূহ বা আত্মার স্তরে সেই হাকিকতের অস্তিত্বশীল রূপটি ছিল একটি বিমূর্ত নির্যাস, যাকে শরীয়ত প্রদাতা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো 'আকল', কখনো 'কলম', কখনো 'নূর' আবার কখনো 'রূহ' হিসেবে ব্যক্ত করেছেন। যেমন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম যা সৃষ্টি করেছেন তা হলো আকল", এবং "আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম যা সৃষ্টি করেছেন তা হলো কলম", এবং "আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম যা সৃষ্টি করেছেন তা হলো আমার রূহ বা আমার নূর"। নিঃসন্দেহে শব্দমালার এই ভিন্নতা স্তরভেদে হয়েছে; কারণ 'সর্বপ্রথম' হওয়ার হাকিকত প্রকৃতপক্ষে কেবল একটি বিষয়ের জন্যই প্রযোজ্য হতে পারে।
সেই হাকিকতের অস্তিত্বশীল রূপটি এক স্তর থেকে অন্য স্তরে স্থানান্তরিত হতে হতে অবশেষে মানবিক উপাদান বিশিষ্ট শারীরিক রূপ লাভ করে, যার প্রথম ব্যক্তি হলেন আদম। তিনি এবং অন্যান্য নবীগণ দৃশ্যমান জগতে শারীরিক রূপে আত্মপ্রকাশ করার আগে নবুওয়তের গুণে গুণান্বিত হননি। তবে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যতিক্রম; কারণ যখন তিনি আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব নিয়ে বিদ্যমান ছিলেন, তখনই আল্লাহ তাঁকে সুসংবাদ দিয়েছিলেন এবং বাস্তবে নবুওয়ত সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। সমস্ত শরীয়তেই মূলত বিধান প্রদানের অধিকার তাঁকে দেওয়া হয়েছিল, তবে তা কার্যকর হয়েছিল তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরিত নবী ও রাসূলগণের মাধ্যমে। যেমন দৃশ্যমান জগতে আলী ও মুয়াজ ইবনে জাবাল তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে ইয়ামেনে গিয়েছিলেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে বিধান পৌঁছে দিয়েছিলেন। কেননা নবুওয়তের সাব্যস্ত হওয়া কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত শরীয়তের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। সুতরাং সকল শরীয়ত মূলত তাঁরই শরীয়ত, যা তাঁর প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সৃষ্টির কাছে পৌঁছেছে। যখন তিনি জাগতিক শারীরিক অস্তিত্ব নিয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন, তখন সেই শরীয়তগুলোকে রহিত করে দিলেন যা অভ্যন্তরীণ চাহিদানুযায়ী নির্ধারিত ছিল। কেননা উম্মতদের যোগ্যতা ও গ্রহণক্ষমতার ভিন্নতাই শরীয়তের ভিন্নতাকে অনিবার্য করে তুলেছিল।
'ফুসুসুল হিকাম' ও এর ব্যাখ্যাগ্রন্থে রয়েছে, কোনো নবীই খাতামুন নবীয়্যীনের আলোকবর্তিকা ব্যতিরেকে কোনো পূর্ণতা অর্জন করতে পারেননি, যদিও তাঁর মাটির অস্তিত্ব তাঁদের পরে এসেছে। কারণ তাঁর আলোকবর্তিকার সাথে তাঁর মাটির অস্তিত্বের কোনো আবশ্যিক সম্পর্ক নেই। তিনি তাঁর হাকিকত বা সত্তাগত দিক থেকে তাঁদের পূর্বেই বিদ্যমান ছিলেন; কারণ তিনি হলেন রূহসমূহের পিতা, যেমন আদম হলেন দেহসমূহের পিতা।তাঁর নূর সৃষ্টির পদ্ধতি সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা এসেছে। সেগুলোর সারকথা হলো, আল্লাহ তাআলা আকাশমন্ডলী, পৃথিবী, আরশ, কুরসি, লাওহ, কলম, জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা, মানুষ, জিন এবং অন্যান্য সমস্ত মাখলুকাত সৃষ্টির বহু হাজার বছর পূর্বে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নূর সৃষ্টি করেছেন। সেই নূরকে পবিত্র জগতের মহাকাশে দেখা যেত। আল্লাহ কখনো তাঁকে সিজদার নির্দেশ দিতেন, আবার কখনো তাসবিহ ও পবিত্রতা বর্ণনার নির্দেশ দিতেন। আল্লাহ তাঁর জন্য পর্দা সৃষ্টি করেছিলেন এবং প্রতিটি পর্দায় তাঁকে দীর্ঘকাল অবস্থান করিয়েছিলেন, যেখানে তিনি আল্লাহর বিশেষ তাসবিহ পাঠ করতেন। পর্দাগুলো থেকে বের হওয়ার পর তিনি যখন নিঃশ্বাস ছাড়লেন, তখন তাঁর সেই নিঃশ্বাস থেকে নবীগণ, ওলিগণ, সিদ্দিকগণ, শহীদগণ এবং অন্যান্য মুমিন ও ফেরেশতাদের রূহ সৃষ্টি করা হলো। যেমন জাবির ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন: আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আল্লাহ সর্বপ্রথম কোন জিনিসটি সৃষ্টি করেছেন? তিনি বললেন: "হে জাবির! তা হলো তোমার নবীর নূর। আল্লাহ তা সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকে সমস্ত কল্যাণ সৃষ্টি করেছেন এবং এরপর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।" যখন আল্লাহ তা সৃষ্টি করলেন, তখন তাঁকে তাঁর সামনে নৈকট্যের স্থানে বারো হাজার বছর রেখেছিলেন। অতঃপর তাকে চার ভাগে বিভক্ত করলেন: এক ভাগ থেকে আরশ সৃষ্টি করলেন, এক ভাগ থেকে কুরসি সৃষ্টি করলেন, এক ভাগ থেকে আরশ বহনকারী ফেরেশতা ও কুরসির রক্ষকদের সৃষ্টি করলেন এবং চতুর্থ ভাগকে মহব্বতের স্থানে বারো হাজার বছর রাখলেন। এরপর সেই চতুর্থ ভাগকে পুনরায় চার ভাগে বিভক্ত করলেন: এক ভাগ থেকে মাখলুকাত সৃষ্টি করলেন, এক ভাগ থেকে লাওহ সৃষ্টি করলেন, এক ভাগ থেকে জান্নাত সৃষ্টি করলেন এবং চতুর্থ ভাগকে ভয়ের স্থানে বারো হাজার বছর রাখলেন। এরপর তাকে চার অংশে বিভক্ত করলেন...
অতঃপর তিনি এক অংশ থেকে ফেরেশতা সৃষ্টি করলেন, এক অংশ থেকে সূর্য সৃষ্টি করলেন, এক অংশ থেকে চাঁদ ও নক্ষত্রসমূহ সৃষ্টি করলেন এবং চতুর্থ অংশটিকে বারো হাজার বছর ধরে আশার স্থানে (মাকামে রাজা) রাখলেন। এরপর সেটিকে চার ভাগে বিভক্ত করলেন; এক ভাগ থেকে আকল (বুদ্ধি), এক ভাগ থেকে সহনশীলতা ও জ্ঞান, এক ভাগ থেকে পবিত্রতা ও তৌফিক সৃষ্টি করলেন এবং চতুর্থ অংশটিকে বারো হাজার বছর ধরে লজ্জার স্থানে (মাকামে হায়া) রাখলেন। অতঃপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সেটির দিকে দৃষ্টিপাত করলেন, ফলে সেই নূর ঘাম হিসেবে নিঃসৃত হলো এবং তা থেকে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নূরের ফোঁটা ঝরল। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা প্রতিটি ফোঁটা থেকে একজন নবী বা রাসূলের রুহ সৃষ্টি করলেন। এরপর নবীদের রুহসমূহ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল, আর আল্লাহ তাদের সেই নিঃশ্বাস থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আসা ওলী, সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, শহীদ এবং অনুগত মুমিনদের নূর সৃষ্টি করলেন। সুতরাং আরশ ও কুরসি আমার নূর থেকে, কারুবীয় ফেরেশতারা আমার নূর থেকে, আধ্যাত্মিক ফেরেশতারা আমার নূর থেকে, সাত আসমানের ফেরেশতারা আমার নূর থেকে, জান্নাত ও তার মধ্যকার সমস্ত নিয়ামত আমার নূর থেকে, সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি আমার নূর থেকে, আকল, ইলম ও তৌফিক আমার নূর থেকে, নবী ও রাসূলগণের রুহসমূহ আমার নূর থেকে এবং শহীদ ও নেককার ব্যক্তিগণ আমার নূরের ফলস্বরূপ। অতঃপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বারোটি পর্দা সৃষ্টি করলেন এবং নূরটিকে—যা ছিল চতুর্থ অংশ—প্রতিটি পর্দায় এক হাজার বছর করে রাখলেন। এগুলো হলো দাসত্বের স্তরসমূহ, যথা: সম্মানের পর্দা, সৌভাগ্যের পর্দা, গাম্ভীর্যের পর্দা, রহমতের পর্দা, দয়ার পর্দা, সহনশীলতার পর্দা, জ্ঞানের পর্দা, মর্যাদার পর্দা, প্রশান্তির পর্দা, ধৈর্যের পর্দা, সত্যবাদিতার পর্দা এবং দৃঢ় বিশ্বাসের পর্দা। সেই নূর প্রতিটি পর্দায় এক হাজার বছর করে আল্লাহর ইবাদত করল। যখন নূরটি পর্দাগুলো থেকে বের হলো, আল্লাহ তাকে পৃথিবীতে স্থাপিত করলেন। অন্ধকার রাতে প্রদীপের মতো তা পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত আলোকিত করত। অতঃপর আল্লাহ পৃথিবীতে আদমকে সৃষ্টি করলেন এবং তার কপালে সেই নূর স্থাপন করলেন। এরপর তা আদম থেকে শীসের কাছে, তার থেকে ইয়ানিশের কাছে স্থানান্তরিত হলো। এভাবে নূরটি এক পবিত্র বংশ থেকে অন্য পবিত্র বংশে স্থানান্তরিত হতে থাকল, যতক্ষণ না আল্লাহ তায়ালা তাকে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিবের পৃষ্ঠদেশে এবং সেখান থেকে আমিনার গর্ভে পৌঁছে দিলেন। অতঃপর তিনি আমাকে দুনিয়াতে পাঠালেন এবং আমাকে রাসূলগণের সর্দার, শেষ নবী, বিশ্বজগতের জন্য রহমত এবং কিয়ামতের দিন উজ্জ্বল মুখমণ্ডল ও হাত-পা বিশিষ্ট মুমিনদের নেতা বানালেন। হে জাবির, এভাবেই তোমার নবীর সৃষ্টির সূচনা হয়েছিল। বায়হাকী এটি উল্লেখ করেছেন। ইমাম মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে মাখলুকের তাকদির লিখে রেখেছেন, তখন তাঁর আরশ পানির উপরে ছিল। এবং মূল কিতাব বা উম্মুল কিতাবে যা লেখা ছিল তার মধ্যে একটি হলো—মুহাম্মদ শেষ নবী। আরবায ইবনে সারিয়া থেকে বর্ণিত যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর বান্দা এবং শেষ নবী, তখনো আদম তার মাটির অবয়বে পড়ে ছিলেন। আমি তোমাদেরকে আমার প্রাথমিক অবস্থা সম্পর্কে জানাব: আমি ইব্রাহিমের দোয়া, ঈসার সুসংবাদ এবং আমার মায়ের দেখা সেই স্বপ্ন যা তিনি আমাকে জন্ম দেওয়ার সময় দেখেছিলেন—তার থেকে এমন এক নূর নির্গত হয়েছিল যা শামের প্রাসাদগুলোকে আলোকিত করে দিয়েছিল। এটি আহমাদ, বায়হাকী ও হাকীম বর্ণনা করেছেন এবং হাকীম একে সহীহ সনদের হাদীস বলেছেন। শারহুস সুন্নাহ গ্রন্থেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। তার উক্তি: 'তার মাটিতে মথিত (মুঞ্জাদিল)'—এর অর্থ হলো রুহ ফুঁক দেওয়ার আগে মাটিতে পড়ে থাকা অবয়ব। মাইসারা আদ-দাব্বী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কখন নবী হয়েছিলেন? তিনি বললেন: যখন আদম রুহ ও শরীরের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন। এটি ইমাম আহমদের বর্ণনার শব্দ। ইমাম বুখারী তার ইতিহাসে এবং আবু নুয়াইম 'হিলিয়া' গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেছেন এবং হাকীম একে সহীহ বলেছেন। আর মানুষের মুখে 'আমি তখনো নবী ছিলাম যখন আদম পানি ও কাদার মাঝে ছিলেন' মর্মে যে বর্ণনাটি প্রসিদ্ধ, সে সম্পর্কে হাফেজ শেখ আবু আল-খায়ের সাখাবী তার 'আল-মাকাসিদ আল-হাসানা' কিতাবে বলেছেন: আমরা এই শব্দে কোনো বর্ণনা খুঁজে পাইনি। সমাপ্ত। হাফেজ ইবনে রজব 'আল-লাতাইফ' গ্রন্থে বলেছেন: কেউ কেউ 'আপনি কখন নবী হিসেবে লিখিত হয়েছেন' (লিখন অর্থে) বর্ণনা করেছেন। উত্তরে তিনি বলেন: আমি লিখিত হয়েছি যখন আদম রুহ ও শরীরের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন। আরবায ইবনে সারিয়ার বর্ণনার সাথে এই বর্ণনাটির সমন্বয় করলে তার নবুওয়াত অবধারিত হওয়া, সাব্যস্ত হওয়া এবং প্রকাশ পাওয়ার অর্থ পাওয়া যায়। কারণ 'লিখন' শব্দটি কোনো কিছু অবধারিত বা ওয়াজিব হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: 'তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ (লেখা) করা হয়েছে' এবং 'আল্লাহ লিখে রেখেছেন যে—আমি এবং আমার রাসূলগণ অবশ্যই বিজয়ী হব'। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত যে, সাহাবীগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জন্য নবুওয়াত কখন অবধারিত হয়েছে? তিনি বললেন: যখন আদম রুহ ও শরীরের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন। তিরমিযী এটি বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন এটি হাসান হাদীস। ইবনে সাহল আল-কাত্তানের 'আমালি'র একটি অংশে সাহল ইবনে সালেহ আল-হামদানি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে আলীকে জিজ্ঞাসা করলাম, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কীভাবে নবীদের অগ্রগণ্য হলেন অথচ তিনি প্রেরিত হয়েছেন সবার শেষে? তিনি বললেন: আল্লাহ তায়ালা যখন বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য রেখে জিজ্ঞাসা করলেন—'আমি কি তোমাদের রব নই?' তখন মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সর্বপ্রথম বলেছিলেন—'হ্যাঁ'। এই কারণেই তিনি নবীদের অগ্রগামী হয়েছেন, যদিও তিনি সবার শেষে প্রেরিত হয়েছেন। যদি বলা হয় যে, নবুওয়াত এমন একটি গুণ যার জন্য গুণান্বিত ব্যক্তিটির বিদ্যমান থাকা আবশ্যক এবং এটি কেবল প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরই অর্জিত হয়...
তাঁর ওপর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক। তারপর তিনি আরেকটি দরজা খুললেন, যেখানে একটি সাদা ছবি ছিল। আর সেটি ছিল আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছবি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কি একে চেনো?" আমরা বললাম, "হ্যাঁ, ইনি মুহাম্মদ, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম" এবং আমরা কেঁদে ফেললাম। তিনি বললেন, "আল্লাহ জানেন যে এটি তিনিই।" তারপর তিনি দাঁড়ালেন এবং পুনরায় বসলেন। তিনি বললেন, "আল্লাহর কসম, তোমাদের দ্বীনের শপথ করে বলো, ইনি কি তিনিই?" আমরা বললাম, "হ্যাঁ, তিনি ঠিক যেমন, আমরা তাকে তেমনই দেখছি।" তিনি কিছুক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন, "জেনে রাখো, এটিই ছিল সর্বশেষ ছবি, কিন্তু তোমাদের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য আমি এটি দ্রুত দেখালাম।" তারপর তিনি ফিরে গিয়ে আরেকটি দরজা খুললেন এবং সেখান থেকে একটি কালো রেশমি কাপড় বের করলেন। তাতে একটি শ্যামবর্ণের ছবি ছিল। একজন লোক, যাঁর চুল ছিল কুঞ্চিত, চোখ কোটরাগত কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন, গম্ভীর মুখমণ্ডল, দাঁতগুলো একটির ওপর একটি সাজানো এবং ঠোঁট সংকুচিত, যেন তিনি রাগান্বিত। তিনি বললেন, "তোমরা কি একে চেনো?" আমরা বললাম, "না।" তিনি বললেন, "ইনি ইমরান-পুত্র মুসা আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম।"
তাঁর পাশেই তাঁর মতো দেখতে আরেকটি ছবি ছিল, তবে তাঁর মাথায় তেল মাখানো ছিল, কপাল চওড়া এবং চোখে কিছুটা টেরা ভাব ছিল। তিনি বললেন, "তোমরা কি একে চেনো?" আমরা বললাম, "না।" তিনি বললেন, "ইনি ইমরান-পুত্র হারুন আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম।" তারপর তিনি আরেকটি দরজা খুললেন এবং একটি সাদা রেশমি কাপড় বের করলেন। তাতে একজন শ্যামবর্ণের মানুষের ছবি ছিল, যাঁর চুল ছিল সোজা, উচ্চতা ছিল মাঝারি, তাঁকে রাগান্বিত দেখাচ্ছিল কিন্তু মুখমণ্ডল ছিল সুন্দর। তিনি বললেন, "তোমরা কি একে চেনো?" আমরা বললাম, "না।" তিনি বললেন, "ইনি লুত আলাইহিস সালাম।"
তারপর তিনি আরেকটি দরজা খুললেন এবং একটি সাদা রেশমি কাপড় বের করলেন। তাতে একজন শ্বেতবর্ণের মানুষের ছবি ছিল, যাঁর মধ্যে লাল আভা ছিল, গালের দুই পাশ ছিল পাতলা এবং মুখমণ্ডল ছিল সুন্দর। তিনি বললেন, "তোমরা কি একে চেনো?" আমরা বললাম, "না।" তিনি বললেন, "ইনি ইসহাক আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম।" তারপর তিনি আরেকটি দরজা খুললেন এবং একটি সাদা রেশমি কাপড় বের করলেন। তাতে ইসহাকের ছবির মতো একটি ছবি ছিল, তবে তাঁর নিচের ঠোঁটে একটি তিল ছিল। তিনি বললেন, "তোমরা কি একে চেনো?" আমরা বললাম, "না।" তিনি বললেন, "ইনি ইয়াকুব আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম।"
তারপর তিনি আরেকটি দরজা খুললেন এবং একটি কালো রেশমি কাপড় বের করলেন। তাতে একজন শ্বেতবর্ণের মানুষের ছবি ছিল, যাঁর মুখমণ্ডল সুন্দর, নাক ছিল খাঁড়া, সুঠাম দেহ, চেহারায় নূর চমকাচ্ছিল, তাঁর চেহারায় বিনয় প্রকাশিত হচ্ছিল এবং গায়ের বর্ণে লাল আভা ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কি একে চেনো?" আমরা বললাম, "না।" তিনি বললেন, "ইনি তোমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বপুরুষ ইসমাইল।" তারপর তিনি আরেকটি দরজা খুললেন এবং একটি সাদা রেশমি কাপড় বের করলেন। তাতে এমন একটি ছবি ছিল যা আদম আলাইহিস সালামের ছবির মতো মনে হচ্ছিল এবং তাঁর চেহারা ছিল সূর্যের মতো উজ্জ্বল। তিনি বললেন, "তোমরা কি একে চেনো?" আমরা বললাম, "না।" তিনি বললেন, "ইনি ইউসুফ আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম।"
তারপর তিনি আরেকটি দরজা খুললেন এবং একটি সাদা রেশমি কাপড় বের করলেন। তাতে একজন লালবর্ণের মানুষের ছবি ছিল, যাঁর পায়ের নলা ছিল চিকন, চোখ ছিল ছোট, পেট কিছুটা বড়, উচ্চতা মাঝারি এবং গলায় তলোয়ার ঝুলানো ছিল। তিনি বললেন, "তোমরা কি একে চেনো?" আমরা বললাম, "না।" তিনি বললেন, "ইনি দাউদ আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম।" তারপর তিনি সেটি গুটিয়ে ফেললেন এবং একটি সাদা রেশমি কাপড় বের করলেন। তাতে স্থূল নিতম্ব এবং লম্বা পা বিশিষ্ট এক ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে আছেন এমন ছবি ছিল। তিনি বললেন, "তোমরা কি একে চেনো?" আমরা বললাম, "না।" তিনি বললেন, "ইনি দাউদ-পুত্র সুলাইমান আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম।"
তারপর তিনি আরেকটি দরজা খুললেন এবং একটি কালো রেশমি কাপড় বের করলেন। তাতে একটি সাদা ছবি ছিল, যেখানে একজন যুবক ব্যক্তির প্রতিকৃতি ছিল, যাঁর দাড়ি ছিল অত্যন্ত কালো, মাথায় প্রচুর চুল, চোখ দুটি ছিল সুন্দর এবং মুখমণ্ডল ছিল লাবণ্যময়। তিনি বললেন, "তোমরা কি একে চেনো?" আমরা বললাম, "না।" তিনি বললেন, "ইনি মারইয়াম-পুত্র ঈসা আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম।" আমরা বললাম, "আপনি এই ছবিগুলো কোথায় পেলেন? আমরা নিশ্চিত যে এগুলো নবীদেরই ছবি, কারণ আমরা আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছবি দেখেছি যা হুবহু তাঁর মতো।" তিনি বললেন, "আদম আলাইহিস সালাম তাঁর মহান রবের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন যেন তিনি তাঁর সন্তানদের মধ্য থেকে নবীদের তাঁকে দেখান। অতঃপর আল্লাহ তাদের ছবি অবতীর্ণ করেন এবং সেগুলো সূর্যাস্তের স্থানে আদমের ভাণ্ডারে সংরক্ষিত ছিল। যুল-কারনাইন সূর্যাস্তের স্থান থেকে সেগুলো উদ্ধার করেন এবং দানিয়ালের কাছে রেশমি কাপড়ে সেগুলো পৌঁছে দেন। এগুলোই মূলত সেই ছবি যা দানিয়াল অঙ্কন করেছিলেন।"
তারপর তিনি বললেন, "আল্লাহর কসম, আমার মন সন্তুষ্ট হয়েছে।" অন্য বর্ণনায় আছে— "আমি যদি আমার রাজত্ব ত্যাগ করতে পারতাম এবং মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর সিংহাসনের এক নগণ্য সেবক হয়ে থাকতে পারতাম!" তারপর তিনি আমাদের উপহার দিলেন এবং বিদায় জানালেন। যখন আমরা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে পৌঁছলাম এবং যা দেখেছি ও তিনি যা বলেছেন সব বিস্তারিত বর্ণনা করলাম, তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, "বেচারা! আল্লাহ যদি তার মঙ্গল চাইতেন তবে তিনি অবশ্যই তা করতেন।" তিনি বললেন, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জানিয়েছিলেন যে, তারা এবং ইহুদিরা নবীর গুণাবলি খুঁজে পায়। আল্লাহ তাআলা বলেন: তারা তাদের নিকট তাওরাত ও ইঞ্জিলে তা লিখিত পায়।" এই হাদিসটি আবু বকর আল-কাফফাল আশ-শাশি বর্ণনা করেছেন আল-হাসান সাহেবে শাফি থেকে, তিনি ইব্রাহিম বিন হাইসাম থেকে, যেমনটি 'আল-মুত্তাকি' গ্রন্থে রয়েছে। আর কাব আল-আহবার থেকে বর্ণিত যে, যখন ইব্রাহিমের মৃত্যু নিকটবর্তী হলো, তিনি তাঁর সন্তানদের একত্র করলেন—সেদিন তাঁরা ছয়জন ছিলেন—এবং একটি সিন্দুক এনে তা খুললেন। তিনি বললেন, "হে প্রিয় সন্তানেরা, এই সিন্দুকটির দিকে তাকাও।" তারা সিন্দুকটির দিকে তাকালো এবং সমস্ত নবীদের সংখ্যার সমপরিমাণ প্রকোষ্ঠ দেখতে পেল। নবীদের প্রকোষ্ঠগুলোর মধ্যে সর্বশেষটি ছিল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকোষ্ঠ, যা লাল ইয়াকুত পাথর দিয়ে তৈরি ছিল। সেখানে দেখা গেল তিনি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছেন এবং তাঁর ডানপাশে অনুগত প্রৌঢ় আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু রয়েছেন, যাঁর কপালে লেখা ছিল 'ইনিই প্রথম'...
তাঁর উম্মতের মধ্য থেকে যারা তাঁর অনুসরণ করে তারা এবং তাঁর বাম দিকে রয়েছেন ফারুক ওমর ইবনুল খাত্তাব, যাঁর কপালে লেখা আছে: লোহার শিং, আমানতদার, কঠোর, আল্লাহর পথে তিনি কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করেন না। তাঁর পেছনে রয়েছেন যুন-নূরাইন উসমান ইবনে আফফান, তিনি তাঁর কোমর ধরে আছেন এবং তাঁর কপালে লেখা আছে: তৃতীয় খলিফা। আর তাঁর সামনে রয়েছেন আলী ইবনে আবু তালিব, যাঁর কাঁধে তলোয়ার উন্মুক্ত এবং কপালে লেখা আছে: ইনি তাঁর ভাই ও তাঁর চাচার পুত্র, আল্লাহর সাহায্য দ্বারা সমর্থিত। 'আল-মুনতাকা' গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, তাঁর কপালে লেখা আছে: আক্রমণকারী সিংহ, পলায়নকারী নয়, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে। তাঁর চারপাশে রয়েছেন তাঁর পিতৃব্যগণ, খলিফাগণ, নেতৃবৃন্দ এবং সবুজ বাহিনী যাদেরকে একটি শিকল বেষ্টন করে আছে; তারা আল্লাহর সাহায্যকারী ও তাঁর রাসূলের সাহায্যকারী। তাদের চেহারা থেকে নূর চমকাচ্ছে, কিয়ামতের দিন তাদেরকে দুনিয়ার সূর্যের নূরের মতো দেখাবে, আল্লাহ তাঁদের সবার ওপর সন্তুষ্ট হোন।
'ফিরদাউসুল আখবার' গ্রন্থে ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি: "আমি জ্ঞানের শহর, আবু বকর তার ভিত্তি, ওমর তার দেয়াল, উসমান তার ছাদ এবং আলী তার দরজা। তোমরা আবু বকর, ওমর, উসমান ও আলী সম্পর্কে ভালো কথা ছাড়া কিছু বলো না।" এটি 'ফাসলুল খিতাব' গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে।
'বাহরুল উলুম' গ্রন্থে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "জিবরাঈল আমাকে সংবাদ দিয়ে বলেছেন— হে মুহাম্মদ, আল্লাহ যখন আদমকে সৃষ্টি করলেন এবং তাঁর বক্ষে রূহ প্রবেশ করালেন, তখন তিনি আমাকে আদন জান্নাত থেকে একটি আপেল নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। আমি তা নিয়ে এলাম এবং আদমের গলায় তা নিংড়ে দিলাম, ফলে পাঁচটি ফোঁটা পড়ল। প্রথম ফোঁটা থেকে আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, দ্বিতীয়টি থেকে আবু বকরকে, তৃতীয়টি থেকে ওমরকে, চতুর্থটি থেকে উসমানকে এবং পঞ্চমটি থেকে আলীকে। এটিই মহান আল্লাহর বাণীর মর্ম: 'তিনিই পানি থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে বংশগত ও বৈবাহিক আত্মীয় করেছেন।' এখানে 'মানুষ' হলেন আপনি, আর 'বংশ ও বৈবাহিক আত্মীয়' হলেন আবু বকর, ওমর, উসমান ও আলী।"
'রিয়াদুন্নদরা' গ্রন্থে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেন: "তোমার মধ্যে ঈসা আলাইহিস সালামের একটি দৃষ্টান্ত রয়েছে; ইয়াহুদিরা তাঁকে ঘৃণা করেছিল এমনকি তারা তাঁর মায়ের ওপর অপবাদ দিয়েছিল, আর খ্রিস্টানরা তাঁকে ভালোবেসেছিল এমনকি তারা তাঁকে এমন মর্যদায় বসিয়েছিল যা তাঁর জন্য নয়।" অতঃপর তিনি বললেন: "আমার ব্যাপারে দুই প্রকার ব্যক্তি ধ্বংস হবে: একজন হলো অতি-উৎসাহী প্রেমিক যে আমার মধ্যে যা নেই তা আরোপ করবে, আর অন্যজন হলো বিদ্বেষী ব্যক্তি যার ঘৃণা তাকে আমার ওপর অপবাদ দিতে প্ররোচিত করবে।" ইমাম আহমদ এটি 'মুসনাদ'-এ বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকেই আরও বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: "অবশ্যই একদল লোক আমাকে ভালোবাসবে এমনকি তারা আমার ভালোবাসার কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করবে, আর একদল লোক আমাকে ঘৃণা করবে এমনকি তারা আমার ঘৃণার কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।" এটি 'মানাকিব' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: "আমার উম্মতের মধ্যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে দয়ালু হলেন আবু বকর, আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভয় পোষণকারী হলেন ওমর, তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লজ্জাশীল হলেন উসমান এবং তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিচারক হলেন আলী। প্রত্যেক নবীর একজন হাওয়ারি বা বিশেষ সহচর থাকে, আমার হাওয়ারি হলো তালহা এবং জুবাইর—যিনি আমার ফুফাতো ভাই। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস যেখানেই থাকুন না কেন, সত্য তাঁর সাথেই থাকে। আবদুর রহমান ইবনে আউফ হলেন পরম করুণাময়ের (রহমানের) ব্যবসায়ীদের অন্তর্ভুক্ত। আবু উবাইদাহ হলেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আমানতদার।" এটি 'উমদাহ' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে এবং 'রিয়াদুন্নদরা' গ্রন্থে অতিরিক্ত বর্ণিত হয়েছে যে, "সাঈদ ইবনে যায়েদ পরম করুণাময়ের প্রিয়জনদের অন্তর্ভুক্ত।"
'বাহরুল উলুম' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "আমার উম্মতের প্রতি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে দয়ালু আবু বকর, আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ওমর, তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে লজ্জাশীল উসমান এবং তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিচারক আলী। তোমাদের মধ্যে হালাল ও হারাম সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী মুয়ায, আল্লাহর কিতাবের সবচেয়ে বড় ক্বারী উবাই (ইবনে কাব), ফারায়েয বা উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী যায়েদ, তোমাদের মধ্যে সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রে (একাই দুই জনের সমান) খুযাইমা ইবনে সাবিত এবং মুনাফিকদের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী হলেন হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান—যিনি পরম করুণাময়ের বিশিষ্ট বন্ধুদের একজন। সাঈদ ইবনে যায়েদ পরম করুণাময়ের প্রিয়জনদের একজন এবং আবদুর রহমান ইবনে আউফ পরম করুণাময়ের ব্যবসায়ীদের একজন। আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আমানতদার। যে ব্যক্তি ঈসা ইবনে মারিয়ামকে দেখতে চায়, সে যেন যায়েদ বিন আবু যরকে দেখে। আমার উম্মতের জন্য ইবনে উম্মে আবদ (ইবনে মাসউদ) যা পছন্দ করেন, আমি তাতে সন্তুষ্ট। জান্নাত সালমানের জন্য তার চেয়েও বেশি ব্যাকুল, সালমান জান্নাতের জন্য যতটুকু ব্যাকুল। খালিদ হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের তলোয়ার। হামযাহ হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সিংহ। আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব আমার চাচা এবং আমার পিতার প্রতিচ্ছবি। হাসান ও হুসাইন জান্নাতী যুবকদের সরদার। জাফর ইবনে আবু তালিব জান্নাতে ফেরেশতাদের সাথে যেখানে ইচ্ছা উড়ে বেড়ান। জান্নাতের দরজায় প্রথম করাঘাত করবেন বেলাল ইবনে হামামাহ। আমার হাউজ থেকে সর্বপ্রথম পান করবেন সুহাইব। কিয়ামতের ময়দানে সর্বপ্রথম ফেরেশতারা মুসাফাহা করবেন আবু দারদার সাথে। জান্নাতের ফল সর্বপ্রথম আহার করবেন আবু দাহদাহ। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর পরম করুণাময়ের প্রতিনিধি দলের অন্তর্ভুক্ত। আম্মার ইবনে ইয়াসির অগ্রবর্তীদের অন্তর্ভুক্ত। প্রত্যেক বিষয়ের একজন অশ্বারোহী থাকে, আর কুরআনের অশ্বারোহী হলেন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস। প্রত্যেক নবীর একজন অন্তরঙ্গ বন্ধু থাকে, আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হলেন সাদ ইবনে মুয়ায। প্রত্যেক নবীর বিশেষ সহচর থাকে, আমার বিশেষ সহচর হলেন তালহা ও জুবাইর। প্রত্যেক নবীর একজন খাদেম থাকে, আমার খাদেম হলেন আনাস ইবনে মালিক। প্রত্যেক উম্মতের একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি থাকে, এই উম্মতের বিজ্ঞ ব্যক্তি হলেন আবু হুরায়রা।"
'ইস্তিআব' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, আবু হুরায়রা হলেন জ্ঞানের আধার। সালমানের কাছে এমন জ্ঞান রয়েছে যা অর্জন করা সম্ভব নয়। আবু যরের চেয়ে সত্যবাদী আর কাউকে নীল আকাশ ছায়া দেয়নি এবং ধূসর জমিন বহন করেনি। হাসান ইবনে সাবিত রূহুল কুদুস (জিবরাঈল আলাইহিস সালাম) দ্বারা সমর্থিত। সমাপ্ত।
কেননা তিনি তাঁর কিতাব এবং নূরের আগমন চেয়েছিলেন, যেমনটি মহান আল্লাহ বলেছেন: "অতঃপর আল্লাহ তাদের নিকট এমনভাবে আসলেন যা তারা কল্পনাও করেনি।" অর্থাৎ তাঁর আদেশ তাদের নিকট আসলো। এর অর্থ হলো সিনাই পাহাড়ে মূসার ওপর তাওরাত অবতীর্ণ করা এবং শামের খলীল অঞ্চলের বাকি অংশেও। ঈসা সেখানে নাসিরাহ নামক একটি গ্রামে বাস করতেন এবং তাঁর অনুসারীদের সেই নামেই 'নাসারা' বলা হয়। 'আনোয়ারুত তানজীল' গ্রন্থে রয়েছে যে, 'নাসারা' হলো 'নাসরানি' শব্দের বহুবচন। 'নাসরানি' শব্দের 'ইয়া' অক্ষরটি আতিশয্য বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন 'আহমারি' শব্দের ক্ষেত্রে হয়। তাদের এই নামকরণ করা হয়েছে কারণ তারা তাঁর সাথে নাসরান বা নাসিরাহ নামক গ্রামে ছিল, তাই সেই জায়গার নামানুসারে তাদের নামকরণ করা হয়েছে। সমাপ্ত। আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ঈসার ওপর ইনজীল অবতীর্ণ হওয়া, যা মূলত ইনজীলের বিধান প্রকাশের রূপক। মুসলিম এবং আহলে কিতাবদের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই যে, 'ফারান' হলো মক্কা। আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর কুরআন অবতীর্ণ হওয়া এবং তাঁর বিধান ও শরীয়তের প্রকাশ ঘটা। আল্লাহই ভালো জানেন।
সুসংবাদসমূহের মধ্যে ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম)-এর বাণীও অন্তর্ভুক্ত: "মহান আল্লাহ ফারান থেকে বর্ণনা নিয়ে এসেছেন এবং আকাশমন্ডলী আহমাদ ও তাঁর উম্মতের তাসবীহে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। তিনি জলে ও স্থলে তাঁর ভালোবাসা বহন করেন। তিনি আমাদের নিকট একটি নতুন কিতাব নিয়ে আসবেন যা বায়তুল মুকাদ্দাস ধ্বংস হওয়ার পর পরিচিতি লাভ করবে।" 'শাওয়াহিদুল নবুওয়াত' গ্রন্থে এমনটিই বর্ণিত হয়েছে। শাইয়া-এর বাণীর মধ্যে রয়েছে: "আমি দু'জন আরোহীকে দেখেছি যাদের কারণে পৃথিবী আলোকিত হয়ে গিয়েছে। তাদের একজন গাধার পিঠে এবং অন্যজন উটের পিঠে আরোহী।" গাধার পিঠে আরোহী হলেন ঈসা এবং উটের পিঠে আরোহী হলেন আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। এছাড়াও তাঁর বাণীতে রয়েছে: "হে আমার কওম! আমি চাঁদের আকৃতির মতো একটি আকৃতি দেখেছি।" মূসা (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম)-এর পক্ষ থেকে বনী ইসরাঈলের প্রতি অসিয়তনামায় রয়েছে: "তোমাদের ভাইদের অর্থাৎ তোমাদের চাচাতো ভাইদের মধ্য থেকে তোমাদের নিকট একজন নবী আসবেন। সুতরাং তোমরা তাঁকে সত্য বলে বিশ্বাস করো এবং তাঁর কথা শ্রবণ করো।"
সুসংবাদসমূহের মধ্যে আরও রয়েছে যে, সত্তর জন ইহুদি পণ্ডিত যার বিশুদ্ধতার ব্যাপারে একমত হয়েছেন, সেই 'সেপটুয়াজিন্ট' তাওরাতের পঞ্চম খণ্ডের দ্বিতীয় অংশে আল্লাহ মূসাকে সম্বোধন করে যা বলেছেন তার অনুবাদ হলো: "আমি তাদের জন্য তাদের ভাইদের বংশ থেকে তোমার মতো একজন নবী আবির্ভূত করব এবং আমার বাণী তাঁর ওপর বর্ষণ করব। আমি তাঁকে যা আদেশ করব তিনি তাদের নিকট তা-ই বলবেন। আর যে ব্যক্তি আমার নামে কথা বলা নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কথা কবুল করবে না, আমি তার থেকে প্রতিশোধ নেব।" এ থেকে বোঝা যায় যে, সেই নবী বনী ইসরাঈল ব্যতীত অন্য কারো মধ্য থেকে অর্থাৎ তাদের ভাইদের বা চাচাতো ভাইদের বংশ থেকে হবেন। এবং তিনি মূসার মতো মর্যাদা, শরীয়ত ও প্রভাবের অধিকারী হবেন। আর তিনি আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছাড়া অন্য কেউ নন। কারণ ইনজীলে বর্ণিত ঈসার বক্তব্য অনুযায়ী ঈসা কোনো শরীয়ত ও প্রভাবের অধিকারী ছিলেন না: "আমি মূসার শরীয়ত পরিবর্তন করতে আসিনি বরং তা পূর্ণ করতে এসেছি।" 'শাওয়াহিদুল নবুওয়াত' গ্রন্থে এমনটিই উল্লেখ আছে।
তবে 'আনোয়ারুত তানজীল' গ্রন্থে এমন বর্ণনা রয়েছে যা নির্দেশ করে যে, ঈসার শরীয়ত মূসার শরীয়তকে রহিতকারী। মহান আল্লাহর বাণী "আমি তোমাদের জন্য সেই সব জিনিসের কিছু অংশ হালাল করে দেব যা তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছিল" এর তাফসীরে বলা হয়েছে: মূসার শরীয়তে যা হারাম ছিল যেমন চর্বি, মাছ, নখযুক্ত প্রতিটি প্রাণী, উটের গোশত এবং শনিবারের আমল। এটি প্রমাণ করে যে তাঁর শরীয়ত মূসার শরীয়তের রহিতকারী। এতে তাঁর তাওরাতের প্রতি সত্যায়নকারী হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি দেখা দেয় না, যেমনটি কুরআনের কিছু আয়াত অন্য আয়াত দ্বারা রহিত হওয়ার কারণে সেগুলোর মধ্যে কোনো বৈপরীত্য বা মিথ্যা প্রতিপন্ন হয় না। কেননা রহিতকরণ মূলত সময়ের বিশেষীকরণের বর্ণনা মাত্র।
'আল-ইনসানুল কামিল' গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, ঈসা মূসার দীনকে রহিত করেছেন কারণ তিনি এমন কিছু নিয়ে এসেছেন যা মূসা নিয়ে আসেননি। বিষয়টি হলো, আল্লাহ তাআলা মূসার ওপর নয়টি ফলকে তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলেন এবং তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তিনি তার মধ্য থেকে সাতটি প্রচার করেন এবং দুটি ফলক রেখে দেন। কারণ সাধারণ মানুষের বিবেক সেই দুটি ফলকে যা ছিল তা গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখত না। মূসা যদি সেই দুটি বিষয়ে সতর্ক করতেন তবে তিনি যা আনয়ন করেছিলেন তা বাধাগ্রস্ত হতো এবং একজন ব্যক্তিও তাঁর ওপর ঈমান আনত না। তাই সেই দুটি ফলক তৎকালীন অন্যদের বাদ দিয়ে কেবল মূসা (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম)-এর জন্য নির্দিষ্ট ছিল।
আর যে ফলকগুলো তাঁকে প্রচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তাতে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জ্ঞান ছিল, কেবল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের জ্ঞান এবং ইব্রাহীম ও ঈসা (আলাইহিমাস সালাতু ওয়াস সালাম)-এর জ্ঞান ব্যতীত। কারণ তাওরাতে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বৈশিষ্ট্যসমূহ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। প্রচারের জন্য নির্দেশিত সাতটি ফলক ছিল পাথরের তৈরি, কিন্তু অপর দুটি ফলক ছিল নূরের তৈরি। সেই সাতটি ফলক পাথরের হওয়ায় তাদের অন্তর কঠোর হয়ে গিয়েছিল। মূসা যদি তাঁর জন্য নির্দিষ্ট দুটি ফলক প্রচারের নির্দেশ পেতেন তবে তাঁর পরে ঈসার আগমনের প্রয়োজন হতো না। কারণ ঈসা সেই অলিখিত দুটি ফলকের রহস্য প্রচার করেছেন এবং মূসার দীনকে রহিত করেছেন। কেননা তিনি এমন কিছু নিয়ে এসেছিলেন যা মূসা নিয়ে আসেননি। কিন্তু তিনি যখন সেই রহস্য প্রকাশ করলেন, তখন তাঁর পরবর্তী সম্প্রদায় পথভ্রষ্ট হয়ে গেল এবং তাঁর উপাসনা শুরু করল। তারা বলল যে তিনি তিনের মধ্যে তৃতীয়, অর্থাৎ পিতা, মাতা ও পুত্র। তারা একে তিন 'উকনুম' বলে অভিহিত করল। ফলে তাঁর সম্প্রদায় তিন দলে বিভক্ত হয়ে গেল: ১. মালকানিয়া, যারা মালকার অনুসারী এবং তারা রোমে আবির্ভূত হয়ে সেখানে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। ২. নাসতুরি, যারা হেকিম নাসতুরের অনুসারী এবং মামুনের যুগে আবির্ভূত হয়েছিল; সে নিজের খেয়ালখুশি মতো ইনজীলে পরিবর্তন সাধন করেছিল। ৩. ইয়াকুবিয়া, যারা ইয়াকুবের অনুসারী। আর তারা ইনজীল থেকে যা অনুবাদ করেছে তার মধ্যে রয়েছে যে, ঈসা বলেছেন: "যখন পারাক্লীত আসবে, তখন সে আমার ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবে।"
আমি একাকী তাঁর দিকে রওয়ানা হলাম এবং এক নিঝুম রাতে পথ চলছিলাম। হঠাৎ আমার ওপর তন্দ্রা ছেয়ে গেল। যখন আমার জ্ঞান ফিরল, দেখলাম আমার উট আমাকে নিয়ে এক নির্জন, ভয়ংকর ও বন্ধুর প্রান্তরে নিয়ে এসেছে। এতে আমি আতঙ্কিত হলাম এবং মনে ভয়ের উদ্রেক হলো। আমি চারদিকে তাকালাম এবং নক্ষত্রের মতো কিছু আগুন দেখতে পেলাম। আমি অতি কষ্টে সেদিকে এগিয়ে গেলাম। যখন কাছে পৌঁছালাম, দেখলাম কতগুলো আগুন কাছাকাছি জ্বলছে এবং সেগুলোকে ঘিরে কিছু সত্তা বসে আছে যারা দেখতে মানুষের মতো নয়। তাদের মাঝে শোরগোল ছিল, কিন্তু আমি সেখানে কোনো ঘরবাড়ি বা গবাদি পশু দেখতে পেলাম না। ভয়ে আমার গায়ের পশম খাড়া হয়ে গেল এবং আমার উটটিও থমকে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করতে লাগল। আমি উটের পিঠ থেকে নিজেকে নিচে ফেলে দিলাম। তখন সেই সত্তাগুলো দলে দলে আমার দিকে এগিয়ে এল। আমি উচ্চস্বরে চিৎকার করে বললাম, "আমি এই দলের নেতার আশ্রয় প্রার্থনা করছি।" তখন তাদের মধ্য থেকে চারজন আমার কাছে এল এবং আমাকে অভিবাদন জানিয়ে আমার পাশে বসল। তাদের চেহারা ছিল বিকৃত এবং দৃশ্য ছিল ভয়ংকর। তাদের একজন আমাকে জিজ্ঞেস করল, "তুমি কোন মানব বংশের?" আমি বললাম, "আমি গাসসান গোত্রের বনূ কায়লা বংশের এক ব্যক্তি।" সে বলল, "তোমার সংকল্প কোথায়?" আমি বললাম, "আমি কি আশ্রয়ে নেই?" সে বলল, "হ্যাঁ, তোমার কোনো ভয় নেই।" তখন আমি তাদের কাছে আমার বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করলাম। এরপর বললাম, "আমরা মানবজাতি গণকদের ওপর নির্ভর করি, কারণ তারা আপনাদের থেকে জ্ঞান লাভ করে। তাই আমার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাকে কিছু অবহিত করুন।" তখন তাদের তিনজন চতুর্থজনের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, "তুমি উপযুক্ত বিশেষজ্ঞের কাছেই এসেছ।" আমি তাকে প্রশ্ন করলাম। সে বলল, "তোমার ডাকনাম কী?" আমি বললাম, "আবু আমির।" সে বলল, "হ্যাঁ হে আবু আমির, তোমার চক্ষু শীতল হোক। এখন এমন এক জ্ঞান গ্রহণ করো যাতে কোনো মিথ্যা নেই। হে আবু আমির, আমি এই নির্জন প্রান্তর এবং মুষলধারে বর্ষিত বৃষ্টির কসম খেয়ে বলছি, শীর্ণকায় উটগুলো অবশ্যই এক মহান নির্দেশদাতার দিকে দ্রুত ধাবিত হবে, যিনি উত্তম রক্ষক। আকাশ থেকে এমন এক নির্দেশদাতার কালাম অবতীর্ণ হবে যা অবাধ্যদের চূর্ণ-বিচূর্ণ করবে এবং রাতের আড্ডাবাজদের বাকরুদ্ধ করে দেবে। হে আবু আমির, আল্লাহ তাআলা মূর্খতা ও বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ব্যক্তিদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। অচিরেই তিনি পারস্য ও রোমের সম্রাটদের পরাজিত করার জন্য এক শক্তিশালী বীরকে প্রেরণ করবেন এবং বিভ্রান্তির যুগকে বিলুপ্ত করবেন।" আবু আমির বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, "এই প্রেরিত ব্যক্তি কি কোনো রাজা হবেন?" সে বলল, "না, বরং তিনি হবেন এক সম্মানিত ও মহান নবী, যিনি অঙ্গীকার পূর্ণকারী এবং বিনয়ী। তিনি বনূ হাশিম বিন আব্দ মানাফ বংশের অন্তর্ভুক্ত হবেন।" আবু আমির বলেন, "আমি দেখতে পাচ্ছি আপনি তাঁর বংশপরিচয় দিচ্ছেন, তবে আপনি কি তাঁর দৈহিক বর্ণনা দিতে পারবেন?" সে বলল, "হ্যাঁ, তিনি হবেন অত্যন্ত উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় চেহারার অধিকারী। তিনি অতি দীর্ঘাকৃতিও নন, আবার অতি খর্বাকৃতিও নন। যখন তিনি তাকাবেন, মনে হবে নক্ষত্র চমকাচ্ছে। যখন তাঁকে কষ্ট দেওয়া হবে, তখন তিনি বিমুখ হবেন এবং ধৈর্য ধারণ করবেন। তাঁর চক্ষুদ্বয় হবে বড় ও সুন্দর এবং তাতে লালচে আভা থাকবে। তাঁর স্কন্ধদ্বয়ের মাঝে একটি চিহ্ন থাকবে। তিনি হবেন উম্মি, যিনি কোনো লিপি লিখবেন না। তিনি সহজ-সরল হানিফ ধর্ম নিয়ে আসবেন। যে ব্যক্তি তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করবে সে সৌভাগ্যবান হবে। আমার কান এ সংবাদ প্রজ্ঞাবান দূতদের নিকট হতে শ্রবণ করেছে।" আবু আমির বলেন, এরপর সে উঠে দাঁড়াল এবং অপর তিনজনও তার অনুসরণ করল। আমি সারা রাত সেখানে অবস্থান করলাম এবং সকাল হলে আমার গন্তব্যের দিকে রওয়ানা হলাম।
আর এই আবু আমিরকে আল্লাহ তাআলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুণাবলি সম্পর্কে এই জ্ঞান দিয়ে কোনো উপকার করেননি। সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত প্রাপ্তির অপেক্ষায় ছিল, কিন্তু যখন তিনি প্রেরিত হলেন, তখন সে হিংসা শুরু করল এবং মানুষকে তাঁর থেকে বিমুখ করতে লাগল এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনল না। সে-ই মসজিদে জিরার নির্মাণ করেছিল এবং মহান আল্লাহর এই বাণীতে তার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে: "আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের জন্য ওত পেতে থাকার ঘাঁটি স্বরূপ।" সে-ই সর্বপ্রথম ওহুদের যুদ্ধে যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করেছিল। সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে বদদোয়া করেছিল যেন আল্লাহ তাকে নির্বাসিত ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যু দেন। আল্লাহ তার সেই দোয়া কবুল করেছিলেন। ফলে সে পুনরায় মূর্তিপূজায় ফিরে যায় এবং মক্কা বিজয় পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে। এরপর মক্কা বিজয়ের দিন সে পলায়ন করে রোম দেশে চলে যায় এবং সেখানে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে নির্বাসিত ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। আমরা আল্লাহর কাছে এমন জ্ঞান থেকে পানাহ চাই যা কোনো উপকারে আসে না এবং এমন অন্তর থেকে যা আল্লাহর ভয়ে ভীত হয় না।
(গণকদের সংবাদের মধ্য হতে একটি হলো) বর্ণিত আছে যে, মারসাদ বিন আব্দ কুলাল একজন মহান রাজা ছিলেন। তিনি স্বপ্নে এমন কিছু দেখলেন যা তাঁকে আতঙ্কিত করে তুলল। যখন তিনি জাগ্রত হলেন, তিনি তা ভুলে গেলেন এবং এর কিছুই তাঁর স্মরণে রইল না। কিন্তু তাঁর অন্তরে কম্পন ও ভয় রয়ে গেল। তাঁর আনন্দ শোকে পরিণত হলো। তিনি গণকদের সমবেত করে তাদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলেন। কিন্তু কেউ তাঁকে তাঁর দেখা স্বপ্ন বা তার ব্যাখ্যা সম্পর্কে কিছুই জানাতে পারল না। একদিন তিনি শিকার করতে বের হলেন এবং শিকারের পিছু নিতে গিয়ে অনেক দূরে চলে গেলেন এবং তাঁর সঙ্গীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। প্রখর রোদে পুড়তে পুড়তে পাহাড়ের চূড়ায় কিছু তাবু তাঁর দৃষ্টিগোচর হলো। তিনি সেই তাবুগুলোর দিকে এগিয়ে গেলেন এবং একটি পৃথক তাবুর দিকে অগ্রসর হলেন। তখন সেখান থেকে এক বৃদ্ধা নারী বেরিয়ে এলেন এবং তাঁকে বললেন, "স্বাগত ও প্রশস্ত হৃদয়ে নেমে আসুন, নিরাপত্তা ও স্থিরতার সাথে। পূর্ণ পেয়ালা ও উপচে পড়া পাত্র আপনার অপেক্ষায়।" তিনি তাঁর ঘোড়া থেকে নামলেন এবং ঘরে প্রবেশ করলেন। যখন তিনি সূর্যের তাপ থেকে আড়ালে এলেন এবং শীতল বাতাস তাঁকে পরশ দিল, তখন তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন এবং দ্বিপ্রহরের তাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর ঘুম ভাঙল না। তিনি উঠে চোখ মুছতে লাগলেন। হঠাৎ দেখলেন তাঁর সামনে এক যুবতী দাঁড়িয়ে আছে যার মতো সুন্দরী তিনি আর কখনো দেখেননি। সে তাঁকে বলল, "হে মহান সম্রাট, আপনার কি খাবারের প্রয়োজন আছে?" রাজা খুব অবাক হলেন এবং নিজের জীবনের ব্যাপারে ভীত হলেন যখন দেখলেন যে মেয়েটি তাঁকে চিনে ফেলেছে। তিনি তার কথা না শোনার ভান করলেন। সে বলল, "ভয় পাবেন না, মানুষ আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক। আপনার পিতামহ অতি মহান এবং আপনার কারণে আমাদের ভাগ্য অতি প্রসন্ন।" এরপর সে তাঁর সামনে সারিদ, শুকনো মাংস ও হাইস পেশ করল এবং মাছি তাড়ানোর জন্য দাঁড়িয়ে রইল যতক্ষণ না তিনি খাওয়া শেষ করলেন। এরপর সে তাঁকে খাঁটি ও সুস্বাদু দুধ পান করাল। তিনি তা পান করলেন এবং মেয়েটির রূপ লাবণ্য নিবিষ্ট মনে দেখতে লাগলেন। তাঁর চোখ তার সৌন্দর্যে জুড়িয়ে গেল এবং অন্তর প্রেমে পড়ে গেল। তিনি বললেন, "হে বালিকা, তোমার নাম কী?" সে বলল, "আমার নাম আফিরা।" তিনি বললেন, "হে আফিরা, তুমি যাকে মহান সম্রাট বলে সম্বোধন করলে সে কে?" সে বলল, "মারসাদ, যিনি অত্যন্ত মর্যাদাবান এবং যিনি সেই কঠিন সমস্যার সমাধানের জন্য গণক ও জ্যোতিষীদের সমবেত করেছেন যা জিনদেরও অস্থির করে তুলেছে।" রাজা বললেন, "হে আফিরা, তুমি কি জানো সেই কঠিন সমস্যাটি কী?" সে বলল, "হ্যাঁ।"